সুইজারল্যান্ডে চলতি বছরের তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার প্রভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো রোমান স্থাপনার চিহ্ন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এসব চিহ্নের ভিত্তিতে দেশটির প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন রোমান নগরীর মানচিত্র নতুন করে তৈরি করছেন।
সুইজারল্যান্ডের ভড (Vaud) ক্যান্টনের আভেনশ (Avenches) শহরের আশপাশে ড্রোন দিয়ে নিয়মিত ছবি তুলে এসব নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এবারের অনুসন্ধানে এমন কিছু স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যেগুলোর অস্তিত্ব আগে জানা ছিল না বা সেগুলোর অবস্থান ও কাঠামো সম্পর্কে ধারণা ছিল অস্পষ্ট।
শুকিয়ে যাওয়া গাছপালায় ফুটে উঠল প্রাচীন স্থাপনা
খরার সময় মাটির নিচে থাকা দেয়াল, রাস্তা কিংবা পাকা কাঠামোর ওপরের গাছপালা আশপাশের তুলনায় দ্রুত শুকিয়ে যায়। কারণ এসব কাঠামো গাছের শিকড়ের কাছে পানির প্রবেশ সীমিত করে। ফলে ওপর থেকে দেখলে শুকিয়ে যাওয়া গাছপালার রেখা বা আকৃতির মধ্য দিয়ে নিচে থাকা স্থাপনার নকশা ফুটে ওঠে। প্রত্নতত্ত্বে এ ধরনের চিহ্নকে ‘পার্চ মার্ক’ বলা হয়।
২০২৬ সালের অস্বাভাবিক গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া আভেনশে এই প্রক্রিয়াকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে ড্রোনভিত্তিক আকাশ জরিপে মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন কাঠামোর পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ড্রোনে ধরা পড়ল গোসলখানা, বাড়ি ও রাস্তা
এক ইতিহাসপ্রেমীর দেওয়া তথ্যের পর ভড ক্যান্টনের প্রত্নতাত্ত্বিক দল আভেনশের আশপাশের মাঠগুলোতে ড্রোন দিয়ে প্রতিদিনের ছবি সংগ্রহ শুরু করে। এ অঞ্চলেই ছিল অ্যাভেন্টিকাম রোমান হেলভেটিয়ার প্রাচীন রাজধানী, যার অবস্থান বর্তমান আভেনশ শহরের এলাকায়।
ড্রোনের ছবিতে প্রাচীন উষ্ণ পানির গোসলখানা বা থার্মাল বাথ, বাড়িঘর, রাস্তা এবং একটি সম্ভাব্য মন্দিরের কাঠামোর চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসবের কিছু এমন এলাকায় শনাক্ত হয়েছে, যেখানে আগে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হয়নি।
ভডের ক্যান্টনাল প্রত্নতাত্ত্বিক জর্ডান আনাস্তাসভের মতে, গত ৫০ বছরের মধ্যে, অন্তত গত দুই প্রজন্মের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার তুলনায়, এটি ওই এলাকায় সবচেয়ে সমৃদ্ধ আবিষ্কারগুলোর একটি।
পুরোনো মানচিত্রেও মিলছে ভুল
আবিষ্কৃত কাঠামোগুলোর অবস্থান বিদ্যমান প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রের ওপর যুক্ত করছেন গবেষকরা। নতুন চিহ্নগুলো বেগুনি রঙে বসিয়ে মানচিত্রের ফাঁকা অংশ পূরণ করা হচ্ছে এবং আগে ভুলভাবে চিহ্নিত কিছু স্থাপনাও সংশোধন করা হচ্ছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক হুগো আমোরোসো বলেন, নতুন তথ্যের কারণে এমন কিছু প্রশ্ন এখন সামনে আসছে, যেগুলো এসব চিহ্ন দৃশ্যমান না হলে হয়তো গবেষকদের সামনে আসত না।
অ্যাভেন্টিকামের প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্র বর্তমানে একটি জিআইএস বা ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করা হয়। এতে পুরোনো মানচিত্র, ভূতাত্ত্বিক ও ভূমির তথ্য, আকাশচিত্র, ভূ-সমীক্ষা এবং আগের ও বর্তমান খননের তথ্য একত্রে রাখা হয়। নতুন আবিষ্কারগুলো সেই তথ্যভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
রোমান সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নগরী ছিল অ্যাভেন্টিকাম
অ্যাভেন্টিকাম ছিল রোমান হেলভেটিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র। প্রায় দুই হাজার বছর আগে এ অঞ্চলের রোমান বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নগরটি রোমান শাসনের অধীনে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
তৃতীয় শতাব্দী থেকে জার্মানিক জনগোষ্ঠীর আক্রমণ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে নগরটির গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এর বহু স্থাপনা মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়।
এখন খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে উদ্ভিদের বৃদ্ধির পার্থক্য সেই চাপা পড়া স্থাপনাগুলোর অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
খরার কারণে হারিয়েও যাচ্ছে কিছু চিহ্ন
তবে এই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সুযোগ স্থায়ী নয়। জুন থেকে আগস্টের মধ্যে ধারণ করা কিছু চিহ্ন পরে ঘাস কাটার পর এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তবে সেপ্টেম্বরেও অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া থাকায় একটি আলফালফা ক্ষেতে প্রাচীন গোসলখানার নতুন একটি জলাধারের পরিধির চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের অন্যান্য অঞ্চল এবং ইউরোপের আরও কিছু জায়গাতেও খরা ও নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ার ফলে পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দৃশ্যমান হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে থাকা এসব নিদর্শনের অনেকগুলো বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ সেগুলোর কাছে নিয়মিত গবেষণার জন্য বিশেষজ্ঞ দল থাকে না।
এখন লক্ষ্য নির্দিষ্ট স্থানে খনন
আভেনশের প্রত্নতাত্ত্বিক দল নতুন তথ্যগুলো সহকর্মী গবেষকদের সামনে উপস্থাপন করবে। পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে নির্দিষ্টভাবে খনন চালানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, এই আবিষ্কারের জন্য খরার মতো পরিবেশগত সংকটকে স্বাগত জানানোর কোনো কারণ নেই। বরং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে যে বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে ব্যবহার করাই এখন তাদের লক্ষ্য।
অ্যাভেন্টিকামের খনন বিভাগের পরিচালক পিয়েরে ব্লঁর ভাষায়, তারা খরা কামনা করবেন না; তবে এর ফলে যে চিহ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো কাজে লাগিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাবেন।
শুটিংয়ে পিছলে পড়ে আহত অমিতাভ বচ্চন
নূহ (আ.)-এর নৌকার খোঁজে তুরস্কে নতুন গবেষণা
পদত্যাগ করেছেন ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি