ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্র আরও জোরালোভাবে সমর্থন দিলে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন বাহিনী সরাসরি হামলায় অংশ নিলে কিংবা হুথিদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে গোয়েন্দা সহায়তা বাড়ালে ওয়াশিংটন নতুন করে সামরিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক রায়ান বোল।

ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আরএএনই-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বোল বলেন, সৌদি আরবের হুথিবিরোধী অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আপত্তি তুলে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের পদক্ষেপ হতে পারে। এতে নতুন করে অস্ত্র, সেনা বা অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় যুক্ত করার প্রয়োজন হবে না।

তবে এর বাইরে গিয়ে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া কিংবা মার্কিন বিমান হামলা চালানো হলে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পাবে।

বোলের ভাষায়, ‘এতে মনে হবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন ইরানিদের সঙ্গে যে যুদ্ধে আটকে পড়েছেন, সেটিকে আরও বিস্তৃত করছেন।’

সম্প্রতি সৌদি আরবে হুথিদের হামলা, যার মধ্যে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রিয়াদকে সামরিকভাবে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক আপত্তি তুলে নেওয়াই কম ব্যয়ের পথ
বোলের মতে, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে যে ধরনের রাজনৈতিক আপত্তি তুলেছিল, তা প্রত্যাহার করা ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল বিকল্প হতে পারে।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হুদাইদায় সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য মানবিক পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

২০১৮ সালে হুদাইদায় অভিযান বন্ধের উদ্যোগেও ওয়াশিংটন ভূমিকা রাখে। একই বছরের শেষ দিকে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় স্টকহোম চুক্তির মাধ্যমে সেখানে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বোল বলেন, রাজনৈতিক আপত্তি তুলে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, সেনা মোতায়েন কিংবা অতিরিক্ত ব্যয়ের দিক থেকে প্রায় কোনো খরচই হবে না। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা এবং সরাসরি বিমান হামলার মতো পদক্ষেপে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

শুধু বিমান হামলায় হুথিদের পরাজিত করা কঠিন

বোলের বিশ্লেষণে, শুধু বিমানশক্তি ব্যবহার করে হুথিদের পরাজিত করা কঠিন। তবে সক্ষম স্থলবাহিনীকে অগ্রসর হতে এবং দখল করা ভূখণ্ড ধরে রাখতে বিমান সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি বাহিনী, বিশেষ করে জায়ান্টস ব্রিগেডের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এসব বাহিনীর পক্ষে নতুন ভূখণ্ড দখল করা এবং তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কতটা সম্ভব হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে কৌশলগত বিমান সহায়তার ওপর।

তবে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর এসব বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি পাল্টা অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

বোলের মতে, লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে হুথিদের অগ্রযাত্রার পর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীগুলোকে কিছুটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় দেখা গেছে। কয়েকটি ইউনিট পুনর্গঠিত হয়ে আবার অভিযান শুরু করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়েছে, তা এখনো অনিশ্চিত।

তিনি বলেন, ‘বড় প্রশ্ন হলো, তাইজের আশপাশে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুদাইদার দিকে অগ্রসর হতে এসব বাহিনী যথেষ্ট সমন্বিত হতে পারবে কি না।’

প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিতে আগ্রহী, আক্রমণে নয়

বোলের মতে, সৌদি আরবকে হুথিদের হামলা থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে বিদেশি সরকারগুলোর সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড পুনর্দখলের জন্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে একই মাত্রার আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া কঠিন।

তিনি সৌদি আরবকে সহায়তায় পাকিস্তানের সামরিক সমর্থন এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, এ ধরনের সহায়তার প্রধান লক্ষ্য সৌদি আকাশসীমা রক্ষা করা এবং নতুন হামলা প্রতিরোধ করা।

অন্যদিকে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর প্রশ্নে বিদেশি শক্তিগুলোর অঙ্গীকার অনেক বেশি জটিল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানে ইসরায়েলের অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের সম্মতি চাইছেন বলে সোমবার হারেৎজ পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরির আশঙ্কায় অভিযানে ইসরায়েলের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু মনে করছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করতে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েমেন কেন বিদেশি শক্তির জন্য কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র?

বোলের মতে, অনেক সরকার ইয়েমেনকে এমন একটি ভূরাজনৈতিক ফাঁদ হিসেবে দেখে, যেখানে সামরিক বাহিনী জড়িয়ে পড়লেও কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করা কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘অনেক সরকারের চোখে দেশটি এমন একটি ভূরাজনৈতিক কৃষ্ণগহ্বর, যেখানে তাদের বাহিনী ঢুকে পড়বে, কিন্তু কখনোই বিজয় অর্জন করতে পারবে না।’

তাঁর মতে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এমন কিছু সামরিক সক্ষমতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে, যা তারা নিজেরা একই মাত্রায় মোতায়েন করতে পারে না। তুরস্ক তার আশপাশের অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হলেও ইয়েমেনের মতো দূরবর্তী স্থানে দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ওয়াশিংটন কী ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করছে, তার ওপরও সম্ভাব্য সামরিক জোটের কার্যকারিতা নির্ভর করবে। লক্ষ্য হতে পারে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ঠেকানো, দখল করা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা কিংবা আরও বিস্তৃত অভিযানের মাধ্যমে রাজধানী সানাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখলের চেষ্টা।

আগের যুদ্ধবিরতি, সামনে নতুন সমীকরণ

২০২৫ সালে হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান অভিযান শেষ হয়েছিল ওই বছরের মে মাসে ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। কিন্তু এবার সৌদি আরবের স্থলবাহিনীকে ভূখণ্ড পুনর্দখলের অভিযানে সহায়তা দেওয়া হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

কারণ, বিমান হামলা চালানো এবং মিত্রবাহিনীকে স্থলযুদ্ধে এগিয়ে নেওয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তই নিতে হবে না; বরং মিত্রবাহিনী কত দূর অগ্রসর হবে, কত দিন অভিযান চলবে এবং কীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানো হবে—সেসব প্রশ্নেও ভূমিকা রাখতে হতে পারে।

বোলের মতে, একটি কার্যকর আক্রমণাত্মক জোট গঠন এবং ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে নির্ধারক।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে বিস্তৃত স্থল অভিযানকে সমর্থন করা ওয়াশিংটনের জন্য এক বিষয় নয়। প্রথমটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে; দ্বিতীয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে। আর ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এমন পদক্ষেপ আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার ও তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত