ডেটা সেন্টার ও সাবমেরিন কেবলকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা কোম্পানিগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে আঞ্চলিক সরকার, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। একই সঙ্গে ‘পারস্য উপসাগর ডেটা কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, পারস্য উপসাগর ডেটা কর্তৃপক্ষ আসছে। আঞ্চলিক সরকার, তহবিল ও কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগ্রাসন বা শিশু হত্যায় সহায়তাকারী কোনো এআই কিংবা ডেটা কোম্পানিকে অর্থ, মালিকানার অংশ, জমি বা জ্বালানি সরবরাহ করা উচিত নয়। তবে প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ কীভাবে কাজ করবে, এর ক্ষমতা কতটুকু হবে কিংবা অন্য দেশে পরিচালিত কোম্পানিগুলোর ওপর ইরান কীভাবে বিধিনিষেধ কার্যকর করবে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি গালিবাফ।

ইরানের কট্টরপন্থী মহলের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিজিটাল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকির মধ্যে তার এ বক্তব্য সামনে এলো। গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে তার বক্তব্যে বলা হয়, যুদ্ধ শুরু হলে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের বহু কেবল, ডেটা সেন্টার ও এআই স্থাপনা ইরানের হামলার আওতায় থাকবে। রেজাই আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে থাকা মার্কিন প্রযুক্তি অবকাঠামো তখন পর্যন্ত সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে সেগুলোতে হামলা হতে পারে।

এর পরদিন কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হানের প্রধান সম্পাদক ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হোসেইন শরিয়তমাদারি রেজাইয়ের বক্তব্যকে সমর্থন করেন। ‘ভালো করেছেন, ভাই মোহসেন!’ শিরোনামের এক নিবন্ধে তিনি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ফাইবার-অপটিক কেবলকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান। শরিয়তমাদারির দাবি, এসব কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাণিজ্যিক, ব্যাংকিং, সামরিক ও এআই-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাহত হতে পারে। তবে তার এ পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সিও এআই অবকাঠামোতে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। ‘কেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লক্ষ্যবস্তুর তালিকায়?’ শিরোনামের এক নিবন্ধে সংস্থাটি দাবি করে, এআই সেন্টারগুলোতে হামলা হলে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।

এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর শরিয়তমাদারি ইরানের সামরিক বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডকে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক কেবল বিচ্ছিন্ন বা অকার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত মে মাসে তাসনিম প্রণালিটি দিয়ে যাওয়া বিদেশি সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল পরিচালনাকারীদের জন্য লাইসেন্স ও বার্ষিক নবায়ন ফি চালুর প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে মেটা, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিকে ইরানি আইনের আওতায় পরিচালনার এবং কেবল রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজে ইরানি কোম্পানিগুলোকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমটি।

১৮ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিকে আগেই হুমকি

মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এর আগেও হুমকি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। গত ৩১ মার্চ আইআরজিসি মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, অ্যাপল, ওরাকল, এনভিডিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এআই কোম্পানি জি৪২-সহ ১৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে। তাদের আঞ্চলিক কার্যক্রম হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।

আইআরজিসির অভিযোগ, এসব মার্কিন প্রযুক্তি ও এআই কোম্পানি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহায়তা করছে। এ সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কর্মীদের কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এর আগে মার্চের শুরুর দিকে ইরানের ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অ্যামাজন জানিয়েছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি স্থাপনায় সরাসরি আঘাত হানা হয়েছিল। বাহরাইনে কাছাকাছি একটি ড্রোন হামলায় তাদের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোম্পানিটির তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় স্থাপনার কাঠামোগত ক্ষতি, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এবং ক্লাউড সেবায় সাময়িক সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে অঞ্চলটির বিভিন্ন গ্রাহক সেবা ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেটা সেন্টার

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বর্তমানে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ রয়েছে।

অন্যদিকে, সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবল আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এসব কেবলের মাধ্যমে সীমান্তপারের তথ্য আদান-প্রদান, আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সরকারি যোগাযোগ পরিচালিত হয়। ফলে ডেটা সেন্টার বা সাবমেরিন কেবলে বড় ধরনের হামলা হলে শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি নয়, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি সেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গালিবাফের প্রস্তাবিত ‘পারস্য উপসাগর ডেটা কর্তৃপক্ষ’ বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সামরিক সংঘাতের সঙ্গে প্রযুক্তি অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও ডিজিটাল যোগাযোগকে যুক্ত করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

জেএম
আরও পড়ুন