এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ায় পাম তেল উৎপাদন-পরিবহনে সংকট

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ পিএম

ইন্দোনেশিয়ায় এল নিনোর প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী খরায় নদীর পানি কমে যাওয়ায় পাম তেল উৎপাদন ও পরিবহনে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ফসল বিক্রি করতে পারছেন না হাজারো ক্ষুদ্র কৃষক। প্রক্রিয়াজাত তেল পরিবহন করতে না পারায় কারখানাগুলোর মজুত ট্যাংক পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে পাম ফল কেনা ও উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে অনেক কারখানা।

দেশটির পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী পাম ফলচাষি সুপেন্দির অভিজ্ঞতা এই সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে। চলতি মাসের শুরুতে নিজের ও আশপাশের কয়েকজন কৃষকের মোট সাত মেট্রিক টন পাম ফল নিয়ে তিনি সাঙ্গাউ শহরের মাল্টি প্রিমা এনতাকাই কারখানায় যান। চার দিন অপেক্ষা করেও ফল বিক্রি করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত কারখানার মজুত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে ফল নিয়ে ফিরে যেতে বলা হয়।

রয়টার্সকে সুপেন্দি বলেন, কারখানা তাঁর ফল গ্রহণ করেনি। এখন এসব ফল কোথায় বিক্রি করবেন, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ার মোট উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ আসে পশ্চিম কালিমান্তান থেকে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এল নিনোজনিত সমস্যার কারণে চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপজুড়ে পাম তেলের উৎপাদন ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমতে পারে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আবহাওয়াগত ঘটনা। এর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাধারণত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দেয়। এ বছর পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার নদী ও কূপের পানি কমে গেছে। একই সঙ্গে বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এসব আগুনের ধোঁয়ায় পশ্চিম কালিমান্তানসহ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কিছু এলাকাও দূষিত হচ্ছে।

কাপুয়াস নদীতে পানি কমে ব্যাহত পাম তেল পরিবহন

ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘতম নদী কাপুয়াসের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৪৩ কিলোমিটার। ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল অ্যাসোসিয়েশন—গাপকির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের উৎপাদিত পাম তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ এই নদীপথে পরিবহন করা হয়।

কিন্তু দীর্ঘ খরায় নদীর পানি কমে বিভিন্ন স্থানে বালুচর জেগে উঠেছে। এতে পণ্যবাহী বার্জ ও টাগবোট আটকে পড়ছে। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, নদীতে আটকে পড়া নৌযানের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

সড়কপথে ট্রাকে পাম তেল পরিবহনের বিকল্প থাকলেও তা সীমিত। কারণ, বার্জের তুলনায় ট্রাকে একসঙ্গে কম পণ্য নেওয়া যায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় ট্রাকও কম রয়েছে। ফলে কারখানায় উৎপাদিত তেল সময়মতো বাজারে পাঠানো যাচ্ছে না।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, ২০১৫ ও ২০১৮ সালেও এল নিনোর সময় একই ধরনের খরা হয়েছিল। তখন পরিস্থিতি প্রায় এক মাস স্থায়ী ছিল। কিন্তু এবার কাপুয়াস নদীর পানি আরও নিচে নেমেছে এবং এর প্রভাব টানা দুই মাস ধরে চলছে।

ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, সাধারণত অক্টোবরে বর্ষা শুরু হলেও এবার তা পিছিয়ে নভেম্বর মাসে শুরু হতে পারে। এতে নদীর পানির স্তর স্বাভাবিক হতে আরও দেরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র দাবানলের প্রভাব থেকেও দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কমছে।

উৎপাদন কমাচ্ছে পাম তেল কারখানাগুলো

পশ্চিম কালিমান্তানের ৫০টি পাম তেল কারখানার মধ্যে ১৩টি নদীপথে পরিবহন সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রদেশটির পাম অয়েল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আরিস সুপ্রাতমান জানান, এসব কারখানার সম্মিলিত প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা প্রদেশটির মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, পরিবহন সমস্যার কারণে সেপ্টেম্বরে পশ্চিম কালিমান্তানের পাম তেলের সরবরাহ আগস্টের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় চালান পাঠাতে দেরি হচ্ছে। মজুত ট্যাংক পূর্ণ হয়ে গেলে কারখানাগুলোকে উৎপাদন কমাতেই হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে গাপকির ২০২৬ সালের ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পাম তেল উৎপাদনের পূর্বাভাস ২ দশমিক ৯ শতাংশ কমানো হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়ায় পাম ফল পরিপক্ব হতে দেরি হওয়াও এর একটি কারণ।

সুপেন্দিকে ফল ফেরত দেওয়া মাল্টি প্রিমা এনতাকাই কারখানার ব্যবস্থাপক দিয়ান কুর্নিয়াওয়ানের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে কারখানাটি ৩০ হাজার টন পাম ফল প্রক্রিয়াজাত করেছিল। সেপ্টেম্বরে তাদের ফল কেনার পরিমাণ কমে ১০ হাজার টনে নেমে এসেছে।

গত ১ অক্টোবর কারখানাটিতে অপরিশোধিত পাম তেলের মজুত ছিল ৮ হাজার ২০০ টন। অথচ তাদের মজুত ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৮ হাজার ৫০০ টন।

দিয়ান জানান, সাধারণত চার দিনে বার্জের মাধ্যমে দুই হাজার টন পাম তেল পাঠানো সম্ভব। কিন্তু ট্রাকে পরিবহন করতে হলে কখনো কখনো দিনে মাত্র ১০০ টন পাঠানো যায়। ট্রাকে পরিবহন শুধু ধীরগতিরই নয়, এতে খরচও বার্জের তুলনায় তিন গুণ বেশি।

আয় কমে যাওয়ায় চাষাবাদেও প্রভাব

পাম ফল বিক্রি করতে না পারায় ক্ষুদ্র কৃষকেরা গাছের পরিচর্যা ও সার কেনার খরচ জোগাতে সমস্যায় পড়ছেন। ক্ষুদ্র পামচাষিদের সংগঠন আপকাসিন্দোর পশ্চিম কালিমান্তান শাখার প্রধান ইন্দ্রা রুস্তান্দি জানান, আয় কমে যাওয়ায় কিছু কৃষক খরচ বাঁচাতে সারের ব্যবহার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছেন।

সাঙ্গাউয়ের ৬৩ বছর বয়সী আরেক কৃষক রহমত উইয়োনো জানান, গত দুই মাস ধরে ফল বিক্রি করতে তাঁকে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কখনো ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে অন্য কারখানায় গিয়েও প্রতি কেজি পাম ফলের জন্য মাত্র ২ হাজার ৬৫০ রুপিয়া প্রস্তাব পেয়েছেন। অথচ তাঁর নিয়মিত কারখানায় তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে গেলে প্রতি কেজিতে ৩ হাজার ৪০০ রুপিয়া পাওয়া যেত।

রহমত বলেন, তাঁর পরিচিত কয়েকজন কৃষক গত দুই মাসে কোনো ফলই সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে দৈনন্দিন খরচ চালাতে তাঁদের কেউ কেউ ঘরে তৈরি কেক ও ডোনাট বিক্রির মতো বিকল্প কাজ বেছে নিচ্ছেন।

খরা, নদীপথে পরিবহন সংকট এবং কারখানার মজুত পূর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে ইন্দোনেশিয়ার পাম তেল খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত