ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ (২৭ অক্টোবর)। এ নির্বাচন ঘিরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের শিবিরে চলছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। তবে এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন এখনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভোটাররা। কোন দলকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইসরায়েলি। তাঁদের ভোট নির্বাচনের ফল এবং সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
অবসরপ্রাপ্ত লাইসেন্সধারী ট্যুর গাইড নাট জিটোমার তাঁদেরই একজন। নির্বাচনের আগের দিনও তিনি ঠিক করতে পারেননি, কোন দলকে ভোট দেবেন। ডান ও মধ্য-ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি ঝোঁক থাকায় গত দুই নির্বাচনে তিনি লিকুদ পার্টিকে এবং তার আগে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডানপন্থি ধর্মীয় জায়নবাদী দল হাবাইত হায়েহুদিকে ভোট দিয়েছিলেন।
তবে এবার মধ্য-ডানপন্থি কোনো দলকে সমর্থন করতে চাইলেও পছন্দসই দল খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। উত্তর ইসরায়েলের কারমিয়েল শহরের বাসিন্দা জিটোমার ইহুদি টেলিগ্রাফিক এজেন্সিকে (জেটিএ) বলেন, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়ানোর পক্ষে অবস্থানের কারণে অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় দলগুলোকে ভোট দিতে চান না তিনি।
একই কারণে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জোটের শরিক ইতামার বেন গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিত এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় জায়নবাদী দলকেও সমর্থন করতে রাজি নন জিটোমার। তাঁর মতে, দল দুটি অতিরিক্ত কট্টর ডানপন্থি।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর প্রতিও পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি বি’ইয়াখাদ দল নিয়েও তাঁর আপত্তি রয়েছে। বেনেটের রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেক সময় পরিবর্তনশীল বলে উল্লেখ করে জিটোমার বলেন, তিনি এক কথা বলেন, আবার কাজ করেন অন্য রকম।
নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন জিটোমার। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে চালানো হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেন। তাঁর ভাষায়, নেতানিয়াহু একসময় ভালো কাজ করলেও ৭ অক্টোবরের ঘটনা তাঁর নেতৃত্বের বড় ব্যর্থতা। এ ছাড়া নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
জিটোমার বলেন, জীবনে আর কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার বিষয়ে এতটা দ্বিধায় পড়েছেন বলে তাঁর মনে পড়ে না।
সিদ্ধান্তহীন ভোটার কতজন?
মারিভ, চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩-এর জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলে ভোট দেওয়ার যোগ্য মানুষের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে জরিপকারী প্রতিষ্ঠান কিভুন গ্লোবাল রিসার্চের প্রধান মিচেল বারাকের ধারণা, এই হার আরও বেশি।
বারাকের হিসাবে, অক্টোবরের শুরুর দিকে সিদ্ধান্তহীন ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। তাঁর মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে যাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁদের ভোট ফলাফলে অবশ্যই প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, ইসরায়েলে ঐতিহাসিকভাবে অনেক সিদ্ধান্তহীন ভোটার নির্বাচনের আগের সপ্তাহান্তে দল বেছে নেন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শনিবারের ধর্মীয় অবকাশ বা শাবাতের খাবারের টেবিলে রাজনৈতিক আলোচনা তাঁদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে।
বারাক আরও বলেন, নতুন ছোট দলগুলোর মধ্যে অন্তত একটি দল যদি নেসেটে আসন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে নির্বাচনের হিসাব বদলে যেতে পারে। জনমত জরিপের ভুলের সম্ভাব্য সীমা কখনো কখনো সংসদে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের সীমার চেয়েও বেশি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু নির্বাচনের আগে প্রকাশিত প্রায় সব জরিপেই দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট কিংবা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন মধ্য-বামপন্থি জোট—কোনোটিই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ফলে ছোট দলগুলোর আসন এবং সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের পছন্দ সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব সিদ্ধান্তহীন ভোট কি বদলে দেবে নির্বাচনের ফল?
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক ওফের কেনিগ অবশ্য সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের প্রভাব নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, জরিপে যাঁদের সিদ্ধান্তহীন বলা হচ্ছে, তাঁদের অধিকাংশই রাজনৈতিকভাবে ইতিমধ্যে একটি জোটের প্রতি ঝুঁকে আছেন। তাঁদের অনেকে একই জোটের ভেতরে কোন দলকে ভোট দেবেন, তা ঠিক করতে পারছেন না।
কেনিগ চলতি মাসের চ্যানেল ১২-এর একটি জরিপের উদাহরণ দেন। ওই জরিপে ৮ শতাংশ ভোটারকে সিদ্ধান্তহীন হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তবে তাঁর মতে, তাঁদের অধিকাংশই নেতানিয়াহুর জোটের কোনো দলকে নাকি একই জোটের অন্য দলকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন।
যেমন, কোনো ভোটার নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং বেন গভিরের কট্টর ডানপন্থি দলের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে না পারলে সরকার গঠনের বৃহত্তর সমীকরণে তার প্রভাব সীমিত হতে পারে। কারণ, দুটি দলই ডানপন্থি সরকার গঠনে সম্মত। মধ্য-বামপন্থি জোটের ভেতরে দল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কেনিগের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের বহুদলীয় ব্যবস্থায় ৩৭টি দল নেসেটের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় একটি দলের পরিবর্তে একই জোটের অন্য দলকে ভোট দেওয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। তাঁর অনুমান, সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ১ শতাংশেরও কম বামপন্থি ও ডানপন্থি—এই দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করবেন।
রাজনৈতিকভাবে কোন দিকে ঝুঁকবেন ভোটাররা?
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালন ইয়াকতার বলেন, সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একটি অংশ মধ্য-ডানপন্থি বা তুলনামূলক নমনীয় ডানপন্থি অবস্থানে রয়েছেন। বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে যাঁরা, তাঁদের জন্য ডানপন্থি দলগুলোর মধ্যে পছন্দের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বাম ও মধ্যপন্থি ভোটাররা বামপন্থি মেরেৎস এবং মধ্য-বামপন্থি লেবার পার্টির একীভূত হওয়ার মাধ্যমে গঠিত ডেমোক্র্যাটস পার্টিকে ভোট দিতে পারেন।
তবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থেকেও যাঁরা বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট, তাঁদের জন্য পছন্দের দল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ৭ অক্টোবরের হামলা ও পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা, অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার উদ্যোগ—এসব বিষয়ে অসন্তোষের কারণে তাঁরা রাজনৈতিকভাবে নিজেদের একা মনে করছেন বলে জানান ইয়াকতার।
পশ্চিম তীরের বাসিন্দা ড্যানিয়েল মেয়ার এমন ভোটারদের একজন। নিজেকে ডানপন্থি হিসেবে পরিচয় দিলেও নেতানিয়াহুর কারণে তিনি কোনো ডানপন্থি দলকে ভোট দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নিজের দায় স্বীকার করে রাষ্ট্রীয় তদন্তের উদ্যোগ না নেওয়া পর্যন্ত তাঁকে সমর্থন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে তিনি হামলার আগের ১৫ বছরের ঘটনাপ্রবাহের দায়ও নেতানিয়াহুর ওপর আরোপ করেছেন।
তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনেটকেও ভোট দিতে চান না মেয়ার। তাঁর ধারণা, বেনেটের দল অতিরিক্ত বামঘেঁষা। অতি-গোঁড়া ইহুদি না হয়েও তিনি নতুন দল চেরেদি পাবলিককে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। দলটি অতি-গোঁড়া ইহুদিদের ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার পক্ষে। মেয়ার মনে করেন, ইসরায়েলি সমাজে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিচ্ছে দলটি।
৭ অক্টোবরের হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তাও ভোটের ইস্যু
নেতানিয়াহু ও তাঁর জোটকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া আডেল রেমার। হামলার সময় দক্ষিণ ইসরায়েলের নিরিম কিবুতজে নিজের বাড়ির বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে প্রাণে বেঁচেছিলেন তিনি। তবে এখনো কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেননি।
রেমারের অভিযোগ, বর্তমান সরকার তাঁদের জন্য বিপর্যয়কর। ৭ অক্টোবরের হামলার পর তো বটেই, তার আগের দুই দশক ধরে গাজা সীমান্তে হামাসের রকেট হামলার সময়ও অনেক রাজনীতিক তাঁদের পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখেছিলেন বলে মনে করেন তিনি।
রেমার এমন একটি দলকে ভোট দিতে চান, যারা ইসরায়েলের সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হামাসের হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। তাঁর মতে, জীবিত জিম্মি এবং শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে লড়াই করা সেনাসদস্যদের সহায়তায় সরকারের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, জিম্মিদের সহায়তার বড় অংশ বেসরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল।
রেমারের অগ্রাধিকার হলো এমন একটি মধ্যপন্থি সরকার গঠন, যারা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারবে এবং দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখবে।
নেতানিয়াহু ও তাঁর বর্তমান জোটের প্রতি গভীর অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন নেতানিয়া শহরের বাসিন্দা লেখক ইভা ওয়েইসও। তিনি এমন দলকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন, যে দল কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিক ও প্রধান অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোকে বাদ দিয়ে সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে বলে তাঁর ধারণা।
ইসরায়েলের ১২০টি সংসদীয় আসনের জন্য এতগুলো দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ওয়েইস একধরনের অনিশ্চিত জুয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে দর-কষাকষি ও জোট নিয়ে সমঝোতা করতে হয়। তাই শুধু কোন দলকে ভোট দেওয়া হবে, তা নয়; নির্বাচনের পর কোন দলগুলো একসঙ্গে সরকার গঠন করতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নিচ্ছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করছেন, তাঁদের ভোট ছোট দলগুলোর আসনপ্রাপ্তি ও সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। অন্যদের মতে, অধিকাংশ সিদ্ধান্তহীন ভোটার একই রাজনৈতিক জোটের ভেতরে দল বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে শুধু তাঁদের সংখ্যার ওপর নয়, বরং ভোটের বণ্টন, ছোট দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট এবং নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনার ওপরও।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবন কী এখানেই শেষ?
টিন সার্টিফিকেট বাতিল করবেন যেভাবে: কারা পারবেন, কী শর্ত
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে?
পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে ইরানের কট্টরপন্থীরা, নেপথ্যে কী?
দেশ ছাড়ার খবর জানিয়ে রুমি বললেন- ‘আপনারা ভালো থাকেন’