ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর ৫ পথ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৫ এএম

ইসরায়েলের ২০২৬ সালের নির্বাচনে কোনো দল বা জোট এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সমর্থন জোগাড় করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনের কারণে জোট গঠনের সমীকরণ হয়ে উঠেছে জটিল।

চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে পেয়েছে ২৭ আসন, যা পার্লামেন্টে কোনো দলের সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা।

অন্যদিকে মধ্যপন্থী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির পেয়েছে ৪৮টি আসন। পাশাপাশি আরব দল রা'আম ও জয়েন্ট লিস্ট সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পাওয়ায় সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের গুরুত্ব বেড়েছে।

এই বিভক্ত ফলাফলে সরকার গঠনের জন্য পাঁচটি সম্ভাব্য পথ সামনে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকটি নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

১. নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের সরকার

সবচেয়ে বড় দল হিসেবে লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে নেতানিয়াহু একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিরোধী শিবিরের মধ্যপন্থী ও ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে।

গাদি আইজেনকটের ইয়াশার, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল আওয়ার হোম এবং নাফতালি বেনেটের টুগেদার গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিতে পারলে এই জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৬৬-তে। অর্থাৎ ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হবে।

তবে আপাতত এ সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কারণ, এমন সরকার গঠন করতে হলে নেতানিয়াহুকে তাঁর স্বাভাবিক রাজনৈতিক মিত্র—কট্টর ডানপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোকে পাশ কাটাতে হতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোকেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাঙতে হবে। কারণ, তাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তবে দীর্ঘ আলোচনার পর কোনো পক্ষই সরকার গঠনে সফল না হলে শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যের সরকারই হতে পারে বিকল্প।

ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত কিংবা অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে উত্তেজনা দুই পক্ষকে ঐক্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

২. ক্ষমতা ভাগাভাগির মাধ্যমে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ঐক্য সরকার

নেতানিয়াহু সবচেয়ে বড় দলের নেতা এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটও বিরোধী শিবিরের চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। এই অবস্থায় তিনি ক্ষমতার মেয়াদ ভাগাভাগি বা পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবে রাজি হবেন—এমন সম্ভাবনা কম।

তবু আইজেনকটের শিবিরের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পদ ভাগাভাগির একটি ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর দুই শিবিরের নেতা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে এই সমীকরণেও বিরোধী নেতাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হবে। কারণ, তাদের নেতানিয়াহুর অধীনেই সরকার পরিচালনায় অংশ নিতে হবে।

৩. বিরোধী দল ভাঙিয়ে ডানপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন

নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জোটের আসন ছিল ৬৪। এবার তা কমে ৫৩-তে নেমেছে। তবে ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জোট গঠনের দক্ষতা তাঁকে এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।

বিরোধী দলগুলোর কয়েকজন সংসদ সদস্যকে নিজের পক্ষে টেনে এনে তিনি ডানপন্থী সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ার চেষ্টা করতে পারেন।

অতীতেও তিনি এমন কৌশল প্রয়োগ করেছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক সমীকরণে ভাঙন ধরিয়ে তিনি ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। তবে সে সময় তাঁর প্রতিপক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবির থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায় করা কতটা সম্ভব হবে, তা অনিশ্চিত।

৪. আইজেনকটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যদি প্রথমে গাদি আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন, তাহলে তিনি নিজের রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে ইয়াশারের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটস, ইসরায়েল আওয়ার হোম এবং অন্যান্য সমমনা দল যুক্ত হতে পারে। তবে ৪৮ আসনের এই শিবিরকে সরকার গঠনের জন্য আরব দল রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন নিতে হবে। তাদের ১৯ আসন যোগ হলে মোট সমর্থন দাঁড়াবে ৬৭-তে।

আরব দলগুলো সরকারে সরাসরি অংশ না নিয়েও বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। তবে এ পথও সহজ নয়। কারণ, নির্বাচনের প্রচারে আইজেনকটের শিবির আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অনেক ইসরায়েলির মনোভাব আরও কঠোর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।

নেতানিয়াহুও নির্বাচনী প্রচারে আরব দলগুলোর সমর্থনকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। এখন পর্যন্ত মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টিই প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর অন্তর্ভুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে রা'আম ও জয়েন্ট লিস্ট—দুই দলই আইজেনকটের শিবিরের সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন সরকারে রা'আম যোগ দিয়েছিল। ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো স্বতন্ত্র আরব দল তখন জোট সরকারে অংশ নেয়। তবে সেই সরকার ১৮ মাসের মাথায় ভেঙে পড়ে।

৫. আবারও নির্বাচন

সরকার গঠনের কোনো সমঝোতা না হলে ইসরায়েলকে আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

চূড়ান্ত ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর তাঁর বিবেচনায় যিনি সরকার গঠনের সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা রাখেন, তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য মনোনীত করবেন।

প্রথম মনোনীত ব্যক্তি ব্যর্থ হলে অন্য কেউ চেষ্টা করতে পারবেন। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেট নিজেই আরেকজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে পারে।

এ প্রক্রিয়ার জন্য প্রায় ১০০ দিনের সময়সীমা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তবে প্রেসিডেন্ট হারজগ ইতোমধ্যে নতুন নির্বাচন এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় খোলা মন নিয়ে আসারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত