ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হবে, না-কি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো হবে—এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে কাজ করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার পথ খোলা রাখতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে কাতার।
শনিবার (৭ নভেম্বর) প্রকাশিত বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ এই মতপার্থক্যের কথা উঠে এসেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় নতুন হামলা চালিয়ে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার পক্ষে সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ। বিপরীতে ভ্যান্স ও উইটকফ যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চাইছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামরিক অভিযানের পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বাণিজ্যের ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত রাখার পক্ষে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে।
নতুন হামলার আগে সময়সীমা নিয়ে তৎপরতা
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা তাকে জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক অভিযানের অর্থায়ন, তদন্ত কিংবা রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে পারে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার ইরান পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন। তবে নতুন হামলার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি-না এবং ভবিষ্যতে তা আবার চালু হওয়ার ঝুঁকি কীভাবে ঠেকানো যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে আরও হামলা চালানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কাতার
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পথ সচল রাখার চেষ্টা করছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আলোচনা কিছুটা ধীর হলেও মধ্যস্থতা বন্ধ হয়নি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্তেজনা কমানো এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করার বিষয়ে আন্তরিক আগ্রহ রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ শিথিল করবে এবং ইরানের কিছু জব্দ করা অর্থ ছাড় করবে। এর বিনিময়ে ইরান বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) আমন্ত্রণ জানাবে বলে আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও মিসরসহ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এসব আলোচনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চীনের সহায়তাও চাইছে ওয়াশিংটন
ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চীনের সহায়তা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থনে ইরানের ওপর প্রভাব খাটাতে বেইজিংকে অনুরোধ করেছেন। চীন সেই বার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
একই সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা যাচাই করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাতারের এক কর্মকর্তা আলি আল-থাওয়াদি বলেছেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ওয়াশিংটনের আচরণে কোনো পরিবর্তন আনে কি-না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে ইরান।
যুদ্ধের ঝুঁকি এখনো কাটেনি
মার্কিন উপদেষ্টাদের মতপার্থক্য এবং কাতারের মধ্যস্থতা সত্ত্বেও নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা রয়েছে। ইরান জানিয়েছে, দেশটির ওপর আবার হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও সামরিক বিকল্প খোলা রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন কয়েকটি পথ রয়েছে- নতুন করে সামরিক অভিযান, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের চাপ অব্যাহত রাখা অথবা সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। প্রতিটি পথেরই রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা না হলে সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
মক্কা-মদিনার পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ, হুথিদের হামলার নিন্দা মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের
বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপমুক্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আহ্বান আরাগচির
ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, কানাডার ৮ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
ইরানের ৭ শর্ত না মানলে খুলবে না হরমুজ প্রণালি, মার্কিন স্থাপনায় আঘাতের হুঁশিয়ারি