রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন কুকুরের দল চিৎকার শুরু করে, তেহরানবাসী বুঝে নেন আবারও শুরু হচ্ছে যমদূত হয়ে আসা যুদ্ধবিমানের গর্জন। এরপরই আকাশে আগুনের গোল্লা আর কানফাটানো বিস্ফোরণ। ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর যুদ্ধের ১৯তম দিনে তেহরান এখন এক চরম আতঙ্ক ও দীর্ঘশ্বাসের শহর। বিবিসি-র সংগৃহীত বিশেষ ফুটেজ ও স্থানীয়দের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এক অবরুদ্ধ ও বিপর্যস্ত জনপদের চিত্র।
বারান (ছদ্মনাম) নামে তেহরানের এক ব্যবসায়ী জানান, ড্রোন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে কেউ ঘরের বাইরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘বাইরে পা রাখা মানেই নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা। মাঝেমধ্যে যখন কোনো শব্দ থাকে না, সেই নিস্তব্ধতাও আমাদের কাছে ভয়ংকর মনে হয়। আমরা কেবল বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’ বারানের মতো হাজারো তরুণ ইরানীর আশা গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময়ই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন তারা না পারছেন প্রতিবাদ করতে, না পারছেন শান্তিতে ঘুমাতে।
তেহরানের রাস্তায় এখন সাধারণ মানুষের চেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বেশি। মাস্ক পরা সশস্ত্র ব্যক্তিরা মোড়ে মোড়ে চেকপয়েন্ট বসিয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি আলী (ছদ্মনাম) জানান, শহরটি এখন ‘মৃত নগরী’র মতো মনে হয়। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে তাকে নিয়মিত অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট বা বিষণ্নতা কাটানোর ওষুধ খেতে হচ্ছে। আলী বলেন, ‘রাস্তায় যাদের দেখি, তারা আমাদের কেউ নয়; তারা সবাই সরকারের লোক। তারা যেন আমাদের কাছ থেকে আমাদের শহরটাই কেড়ে নিয়েছে।’
তেহরানবাসীর মনের অবস্থা এখন দ্বিধাবিভক্ত। তারা একদিকে যেমন বর্তমান শাসনের অবসান চান, তেমনি অন্য দেশের বোমা হামলাও মেনে নিতে পারছেন না। আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের আকাশ এখন শত্রুর নিয়ন্ত্রণে। তবে মনের এক কোণে আশা আছে যে, হয়তো এর মাধ্যমে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে।’
বারানের ভাষায় এই যুদ্ধের যন্ত্রণার ছবিটা আরও স্পষ্ট, ‘জানেন পৃথিবীর অন্য দেশের সাথে আমাদের আকাশের পার্থক্য কী? তারা রাতে তারার নিচে ঘুমায়, আর আমরা ঘুমাই রকেটের নিচে। দুই আকাশই আলো দেয়, কিন্তু সেই আলোর অর্থ ভিন্ন।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ যদি দ্রুত থেমেও যায়, তবে ইরানিদের মনে যে ক্ষত তৈরি হচ্ছে তা সারতে কয়েক প্রজন্ম সময় লাগবে। যুদ্ধ এখন কেবল সীমান্তে নয়, বরং তেহরানের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পরিবারের রক্তে মিশে গেছে। ৬ হাজার বছরের পুরোনো এই শহরটি এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ আর দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে মার্কিন ‘বাঙ্কার বাস্টার’ হামলা
