ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারেই নতুন পথ খুলবে: আইআরজিসি

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সামরিক প্রত্যাহারের সূচনা হিসেবে দেখছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে ইরানের এই প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী বলেছে, ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বহিষ্কার’ পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকেও মার্কিন বাহিনী সরিয়ে দেওয়ার নতুন পথ খুলে দেবে।

আইআরজিসি বলেছে, ‘ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কার করা পশ্চিম এশিয়ার সব অঞ্চল থেকে তাদের বহিষ্কারের সূচনা।’ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো অঞ্চল থেকে সরে গিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা। আইআরজিসির বিবৃতিতে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইরানি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারকে তাদের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে আসছে।

ইরাকে মার্কিন সামরিক মিশনের সমাপ্তি
৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকে তাদের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’ সামরিক মিশন শেষ করার ঘোষণা দেয়। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরাকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবিলায় পরিচালিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশনের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

২০১৪ সালে আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোট আবার ইরাকে সামরিকভাবে সক্রিয় হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে ইরাকি বাহিনীর সঙ্গে মিলে আইএসের দখল করা অঞ্চল পুনরুদ্ধার করা হয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক জোটের সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে শেষ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় এবার ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলো।

তেহরানের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় সামরিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ইরাকে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ফলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়াকে ইরান তাদের আঞ্চলিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করছে। আইআরজিসির পাশাপাশি ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দামও এর আগে বলেছিলেন, মার্কিন বাহিনী ইরাক ও অঞ্চল থেকে চলে গেলে দেশটিতে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইরান জানিয়েছে, তারা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানায়।

তবে ওয়াশিংটনের ইরাক ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে সব মহলের মূল্যায়ন এক নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে যে মার্কিন সামরিক সহায়তা কমে গেলে দেশটিতে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি ইসলামিক স্টেটের ঘুমন্ত সেলগুলো পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কার কথাও কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এসব আশঙ্কা অবশ্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন, নিশ্চিত ফলাফল নয়।

‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বার্তা
আইআরজিসির বিবৃতি থেকে স্পষ্ট, তেহরান ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে শুধু ইরাকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না। বরং এটিকে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিনের ইরানি অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করছে। বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত পুরো অঞ্চল ছেড়ে দেওয়া এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর জনগণকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে দেওয়া। একই সঙ্গে ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে তারা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক মিশন শেষ হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাগদাদের সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইসলামিক স্টেট যাতে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পুনরায় সংগঠিত হতে না পারে, সে জন্য প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা অব্যাহত থাকবে। ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে সামরিক মিশনের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হলেও দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ও কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপটেও ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান এটিকে নিজেদের আঞ্চলিক অবস্থানের পক্ষে একটি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তবে ইরাকে প্রত্যাহার-পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো নির্ধারিত হয়নি।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত