মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই আগাম হামলা করতে চায় ইরানের কট্টরপন্থীরা

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এই ঘোষণাকে আশ্বাস হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক কৌশল বা ফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করছেন ইরানের একাংশের কট্টরপন্থী বিশ্লেষক ও রাজনীতিকেরা। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের আগে প্রায় তিন সপ্তাহের এই সময়কে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আগাম সীমিত হামলা চালানো উচিত তেহরানের। তাদের যুক্তি, এর মাধ্যমে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু না করেও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়িয়ে ইরানের শর্তে সমঝোতায় বাধ্য করা যেতে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ ট্রাম্প ও ইসরায়েলের জন্য পাল্টা হামলার অজুহাত তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অন্যরা।

বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প জানান, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের গঠনমূলক আলোচনা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার এই বক্তব্যের পর সপ্তাহজুড়ে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ক্রমবর্ধমান হুমকির কারণে ওঠানামা করা আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমে যায়।

তবে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের ঘোষণার তাৎপর্য নিয়ে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হেশমাতুল্লাহ ফালাহাতপিশেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রস্তুতির সঙ্গে কোনো দেশের নির্বাচনই সম্পর্কিত নয়। তার মতে, ৩ নভেম্বরের আগে হামলা না চালানোর ট্রাম্পের ঘোষণা মূলত ইরানকে আগাম আঘাত হানা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক পারিসা নাসরও ট্রাম্পের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। ‘ট্রাম্পের অর্থহীন কথা ভুলে যান: তৃতীয় যুদ্ধ আসন্ন’ শিরোনামের এক মন্তব্য প্রতিবেদনে তিনি লেখেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে সামরিক হামলা স্থগিত রাখার দাবি রাজনৈতিক খেলা ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের মতোই বেশি মনে হচ্ছে। নাসরের মতে, ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা কতটা ব্যাপক হতে পারে, সে হিসাবই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কট্টরপন্থী ভাষ্যকার আলিরেজা তাগাভিনিয়াও ট্রাম্পের বক্তব্যকে প্রতারণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সমন্বয়কে সামনে এনে তিনি দাবি করেন, এসব তৎপরতা আসন্ন সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আগাম হামলার পক্ষে কট্টরপন্থীদের যুক্তি

ইরানের কিছু কট্টরপন্থী রাজনীতিক মনে করছেন, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা কম থাকার এই সময়টিই তেহরানের জন্য চাপ সৃষ্টির সুযোগ। তাদের প্রস্তাব, সীমিত সামরিক হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে চাপ তৈরি করা এবং ট্রাম্পকে ইরানের শর্তে চুক্তি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন হামলার উদ্দেশ্য সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং আলোচনায় ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো।

রাজনীতিক আবদোলরেজা দাভারি এক্সে লিখেছেন, নির্বাচনের আগে নতুন হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার কথা বলার অর্থ হলো, যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করেন দাভারি।

তিনি লেখেন, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন সপ্তাহের একটি সুযোগ ইরানের সামনে খুলে গেছে। তার মতে, সামরিক পদক্ষেপকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বৈধ দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা উচিত। অন্য এক পোস্টে তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, এখনই শত্রুকে চেপে ধরতে হবে এবং সেই চাপ থেকে তাকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

তবে এই অবস্থানের বিরোধিতাও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাহমুদ ইরানি নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যবহারকারী যুক্তি দিয়েছেন, ইরান আগে হামলা চালালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রান্ত পক্ষ হিসেবে তুলে ধরে পাল্টা হামলার পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের সুযোগ পেতে পারেন। তার মতে, ইরানের উচিত সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখা, যাতে দেশটির ওপর হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়া যায়।

রেজভান নামে আরেক ব্যবহারকারী সতর্ক করেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের আগাম হামলার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছেন। তার আশঙ্কা, নেতানিয়াহু এমন হামলা ঘটুক, এটাই চাইছেন; কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার অথবা ট্রাম্পের নির্বাচনী সুবিধা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়ছে চাপ

আগাম হামলা নিয়ে এই বিতর্কের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে চাপ বাড়াচ্ছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা ও সামরিক বাহিনী বলছে, তেহরানের অনুমোদন পাওয়া জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজের জন্য এই জলপথ বন্ধ রয়েছে। ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ইরানের এই অবস্থানের বিরোধ রয়েছে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন ইরানের সাতটি শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের মুখপাত্র হাসান গাশগাভিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বেড়েছে বলে ট্রাম্পের দাবি নাকচ করেছেন। রুইদাদ ২৪-কে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ ইরানের হাতেই রয়েছে। বিকল্প পথ ব্যবহার এবং সীমিতসংখ্যক ট্যাংকার চলাচল ইরানের বিধিনিষেধের প্রভাব দূর করতে পারেনি বলেও দাবি করেন তিনি।

শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে তথাকথিত অবৈধ পথে চলাচলকারী একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীটি তাদের হুমকির পরিধি বাড়িয়ে জানায়, অনুমোদনহীন পথে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুধু হরমুজ প্রণালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অঞ্চলটির অন্য জায়গাতেও এসব জাহাজ শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারে।

জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের মাধ্যমে সরাসরি আগাম হামলা না চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ দেখছে তেহরান। ফলে ট্রাম্পের নির্বাচনের আগে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা ইরানের ভেতরে একদিকে আগাম আঘাত হানার দাবি জোরালো করেছে, অন্যদিকে সেই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের সুযোগ করে দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও সামনে এনেছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এএস
আরও পড়ুন