দুর্বিষহ জীবন

আফগানিস্তানে উঠে যাচ্ছে পপি চাষে নিষেধাজ্ঞা

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম

আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পপি চাষ নিষিদ্ধ করেছে তালেবান সরকার। কিন্তু বিকল্প ফসল চাষ করে সংসার চালাতে না পেরে দেশটির অনেক কৃষক আবারও পপি চাষে ফিরছেন। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, খরা, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও খাদ্যসংকটে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের পুষ্টিতেও।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে আফগানিস্তানে পপি চাষের জমির পরিমাণ চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংস্থাটি চলতি বছর প্রায় ৪৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পপি চাষের হিসাব দিয়েছে।

তবে তালেবান কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের এই হিসাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রকৃত চাষের পরিমাণ ওই অনুমানের প্রায় অর্ধেক। তাদের দাবি, পপি নির্মূলে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় বালখ প্রদেশের বাবা ইউসুফ গ্রামের ২৮ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ দাউদ একসময় পপি চাষ করে পরিবারের সারা বছরের খরচ মেটাতে পারতেন। নিষেধাজ্ঞার পর তিনি গম ও তুলা চাষে ঝুঁকেছেন। কিন্তু এসব ফসল থেকে আয় এতটাই কম যে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

রয়টার্সকে দাউদ বলেন, “আমরা ভালো ছিলাম। এখন আমার সন্তানেরা অপুষ্টিতে ভুগছে।”

তিনি জানিয়েছেন, পপি চাষের সময় ভালো দিনে যে আয় হতো, বর্তমানে খারাপ দিনে তার মাত্র চল্লিশ ভাগের এক ভাগ আয় হয়। দাউদ এখনো নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছেন। কিন্তু তাঁর এলাকার কিছু কৃষক আবার গোপনে পপি চাষ শুরু করেছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গত বছর বালখ প্রদেশকে পপিমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ইউএনওডিসি। কিন্তু চলতি বছর সেখানে আবার পপি চাষের সন্ধান পাওয়া গেছে।

আফগানিস্তান একসময় বিশ্বের মোট আফিমের প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদন করত। এই আফিম থেকে চিকিৎসায় ব্যবহৃত মরফিন তৈরির পাশাপাশি অবৈধ মাদক হেরোইনও উৎপাদন করা হয়।

২০২২ সালে তালেবান কর্তৃপক্ষ পপি চাষের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। এর ফলে দেশটির বিস্তীর্ণ পপিক্ষেত প্রায় উধাও হয়ে যায়। কিন্তু বিকল্প জীবিকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এখন চাপে পড়েছে।

ইউএনওডিসির হিসাবে, ২০২৬ সালে আফগানিস্তানে পপি চাষের জমি বেড়ে প্রায় ৪৩ হাজার ৩০০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০২১ সালে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগের বছর জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ বর্তমান চাষের পরিমাণ আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

জাতিসংঘের সংস্থাটির আফগানিস্তান প্রতিনিধি পোলেক ওক সেরেই রয়টার্সকে বলেন, অনেক কৃষকের সামনে পপি চাষে ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকছে না।

চলতি বছর আফগানিস্তানে আফিম বিক্রি থেকে আনুমানিক ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনওডিসি। ২০১৮ সালের পর এটি সর্বোচ্চ আয়; ব্যতিক্রম ছিল ২০২২ সাল, যখন নিষেধাজ্ঞার কারণে সরবরাহ কমে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল।


কৃষি থেকে আয় কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো চলতি মাসে সতর্ক করেছে, আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ১০টিতে এ বছর শিশুদের অপুষ্টির পরিস্থিতি সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৭ সালে এমন প্রদেশের সংখ্যা বেড়ে ১৪ হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু এলাকায় ফসলের ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং কৃষিপণ্যের দাম কম থাকায় দরিদ্র কৃষকেরা লাভ করতে পারছেন না। ফলে পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কেনাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়া এবং নারী অধিকার দমনের কারণে তালেবান সরকারের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাও সংকটকে গভীর করেছে বলে কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন। তবে বালখ প্রদেশের আলম খিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও রোগীদের পরিবারের সদস্যরা শিশুদের অপুষ্টির পেছনে কৃষি আয় কমে যাওয়াকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে সাত মাস বয়সী সন্তান বেঞ্জামিনকে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন তাহিরা। শিশুটির জ্বর ও ডায়রিয়া ছিল। চিকিৎসকেরা তাকে অপুষ্টিতে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন। তাহিরার স্বামী তুলা চাষ করেন।

তাহিরা বলেন, তাঁদের পরিবার এখন কোনোমতে দিন পার করছে। একসময় তাঁদের জীবন ভালো ছিল।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুষ্টিবিষয়ক নার্স সালিমা মোহাম্মাদি বলেন, পপি চাষ বন্ধ হওয়ার পর অনেক পরিবার এমন কোনো বিকল্প ফসল খুঁজে পায়নি, যা দিয়ে আগের মতো আয় করা সম্ভব। তাঁর ভাষায়, কৃষকদের জমি আছে, কিন্তু বছরের পর বছর কৃষি উৎপাদন কমছে।

আফগান কৃষকদের সংকটের পেছনে শুধু পপি নিষেধাজ্ঞাই দায়ী নয়। দীর্ঘস্থায়ী খরা, পানির সংকট এবং বৈধ ফসলের বাজারে দরপতন তাঁদের আয় আরও কমিয়ে দিয়েছে।

বাবা ইউসুফ গ্রামের ৫৬ বছর বয়সী জমির মালিক গুল নাজার জানান, খরার কারণে স্থানীয় নদী ও খালের পানিপ্রবাহ কমে গেছে। কূপের পানিও এতটাই লবণাক্ত হয়ে পড়েছে যে তা ফসলের ক্ষতি করছে।

কৃষকদের ভাষ্য, গম চাষের আয় দিয়ে উৎপাদন ব্যয় মেটানোই কঠিন। তুলার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গুল নাজারের দাবি, গত বছরের শেষ দিকে পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় তুলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা দরপতনে ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে, ফলের বাগান বা বাদামের মতো উচ্চমূল্যের ফসল থেকে আয় পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এসব ফসলের জন্য নির্ভরযোগ্য পানির ব্যবস্থা এবং পণ্য রপ্তানির সুযোগও প্রয়োজন।

ইউএনওডিসির গত বছরের এক জরিপে দেখা গেছে, বালখ ও আশপাশের দুটি প্রদেশের পাঁচটির মধ্যে চারটিরও বেশি পরিবার পপি চাষ থেকে হারানো আয়ের পুরোটা বা বড় অংশ বিকল্প উৎস দিয়ে পূরণ করতে পারেনি।

পপি নিষিদ্ধ করাকে তালেবান সরকার তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে আসছে। এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও ব্যবহার করেছে তারা।

তবে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি চলতি মাসে এক বৈঠকে কৃষকদের বিকল্প জীবিকার জন্য সহায়তার গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।

ইউএনওডিসির প্রতিনিধি ওক সেরেইয়ের মতে, তালেবান সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—কোনো পক্ষ থেকেই বিকল্প জীবিকার জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া হয়নি।

আফগানিস্তানে তালেবানের প্রথম পপি নিষেধাজ্ঞা ২০০০ সালে কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর পর, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে অভিযান চালিয়ে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করলে সেই নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটে।

বর্তমান নিষেধাজ্ঞা আগেরটির তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে টিকে থাকলেও কৃষকদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। খাদ্যসংকট, খরা ও বাজারের অনিশ্চয়তা তাঁদের আবার নিষিদ্ধ ফসলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আফগানিস্তানে পপি চাষ আবার ব্যাপকভাবে বাড়লে তার প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক মাদকবাজারে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন।

জেনেভাভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশ্লেষক প্যাডি জিনের মতে, দেশটির সক্রিয় মাদক পাচার নেটওয়ার্ক এবং সীমান্ত পেরিয়ে মাদক সরানোর সক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলতে পারে।

২০২২ সালে পপি নিষিদ্ধ হওয়ার পর আগের মজুত আফিম আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা সামাল দিয়েছিল। ফলে ইউরোপে মাদকের দামও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়নি। কিন্তু ইউএনওডিসির আশঙ্কা, পুরোনো মজুত কমে আসতে পারে। এতে নতুন করে পপি চাষের আর্থিক প্রণোদনা বাড়বে।

বাবা ইউসুফ গ্রামের কৃষক গুল নাজার জানিয়েছেন, পরিবারের জীবনযাত্রার উন্নতি হলে তিনি আবার পপি চাষে ফিরতে চান না। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কী করবেন, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।

তাঁর কথায়, “মানুষ যখন ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে, তখন সে যেকোনো কিছু করতে পারে।”

আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অবৈধ ফসলের চাষ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন। কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প ফসল, সেচব্যবস্থা, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে পপি চাষ আবারও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

এমএজেড
আরও পড়ুন