তাইওয়ানের আশেপাশে চীনের ৫০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ, তাইপে কি বলছে?

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনকে ঘিরে বিস্তৃত সমুদ্রাঞ্চলে চীনের ৫০টিরও বেশি নৌবাহিনী ও অন্যান্য সরকারি জাহাজের তৎপরতা শনাক্ত করার দাবি করেছে তাইওয়ান। এই তৎপরতাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ‘স্পষ্ট হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তাইওয়ানের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জোসেফ উ বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। এতে মোট ৫৩টি চীনা জাহাজের অবস্থান দেখানো হয়। এর মধ্যে ৩৪টি ছিল নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। তালিকায় চীনের বিমানবাহী রণতরি ‘লিয়াওনিং’-এর অবস্থানও দেখানো হয়েছে।

জোসেফ উ বলেন, চীনের এই তৎপরতার বিষয়ে তাইওয়ান সতর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনের ওপর একই সঙ্গে তৈরি হওয়া হুমকি স্পষ্ট।”

তাইওয়ানের প্রকাশিত মানচিত্র অনুযায়ী, চীনের বিমানবাহী রণতরি লিয়াওনিং ও এর সঙ্গে থাকা নৌবহর ফিলিপাইনের পূর্বদিকে অবস্থান করছিল। এ ছাড়া তাইওয়ানের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকের সমুদ্রাঞ্চলে একাধিক চীনা জাহাজের অবস্থান দেখানো হয়। জাপানের দক্ষিণ উপকূলের কাছেও তিনটি নৌবহরের উপস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে।

চীনা যুদ্ধজাহাজ ও কোস্টগার্ডের তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য এবং মানচিত্র প্রকাশের উদ্যোগ জোরদার করেছে তাইওয়ান। এর আগে গত মে মাসেও একই ধরনের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন জোসেফ উ।

তবে এসব জাহাজের অবস্থান প্রকাশের অর্থ এই নয় যে চীন অবিলম্বে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাহাজগুলোর গতিবিধি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে চীনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাপানও। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বুধবার জানায়, এর আগের দিন কিউশু দ্বীপের কাছে ওসুমি প্রণালি অতিক্রম করে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশের সময় তিনটি চীনা যুদ্ধজাহাজ ও একটি কোস্টগার্ড জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় চলতি মাসে জানিয়েছিল, বিমানবাহী রণতরি লিয়াওনিং একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে, যা কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে পরিচালিত নয়।

এদিকে, জাপানের তাইওয়ান-সমর্থনমূলক অবস্থান নিয়ে বেইজিং অসন্তুষ্ট। অন্যদিকে, দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের বিরোধও সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু বৃহস্পতিবার বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন প্রতিরোধমূলক শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা তাঁরা সমর্থন করেন না।

তাইপেতে পার্লামেন্টে সাংবাদিকদের তিনি জানান, অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি চীনা যুদ্ধজাহাজের তৎপরতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নজরদারি বজায় রাখছে তাঁর মন্ত্রণালয়।

তবে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা বিভাগ ও জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়—কোনো পক্ষই রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা কখনোই পুরোপুরি নাকচ করেনি। তবে বেইজিংয়ের ঘোষিত অবস্থান হলো, তারা ‘শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণ’কে অগ্রাধিকার দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংবাদপত্র স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড চীন আগামী বছরের মধ্যেই তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মঙ্গলবার হাওয়াইয়ে এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন ওই কমান্ডের প্রধান রোনাল্ড ক্লার্ক।

এ প্রসঙ্গে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে তাঁর দেশ। তাঁর মতে, চীন তাইওয়ানকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সম্ভাবনা ত্যাগ করেনি।

তাইওয়ান প্রণালি, পূর্ব চীন সাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর—এই বিস্তৃত অঞ্চল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সামরিক তৎপরতা বাড়লে ভুল হিসাব, অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ কিংবা পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে ৫৩টি জাহাজের অবস্থানসংক্রান্ত তাইওয়ানের প্রকাশিত মানচিত্র একাই আসন্ন যুদ্ধের প্রমাণ নয়। চীনের সামরিক কার্যক্রমের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে জাহাজগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেই পরিস্থিতির প্রকৃত তাৎপর্য মূল্যায়ন করতে হবে।

এমএজেড
আরও পড়ুন