দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর ঐতিহাসিক মিশন শেষে পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার 'আর্টেমিস-২' (Artemis II) এর চার নভোচারী।

প্রশান্ত মহাসাগরে সফল স্প্ল্যাশডাউনের (অবতরণ) মাধ্যমে শেষ হলো তাদের রোমাঞ্চকর ১০ দিনের চন্দ্রাভিযান। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে ভ্রমণের নতুন রেকর্ড গড়লেন তাঁরা।

শ্বাসরুদ্ধকর অবতরণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা
মহাকাশযান 'ওরিয়ন' ক্যাপসুলটি প্রায় চার লাখ ফুট ওপর দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী টানা ছয় মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পর ১৩ মিনিট সময় নিয়ে এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে।

স্প্ল্যাশডাউনের পরপরই মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান রেডিও বার্তায় জানান, ‘কী দুর্দান্ত এক যাত্রা! আমরা স্থিতিশীল রয়েছি এবং চার নভোচারীই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।’
প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ইউএসএস জন পি. মার্থা নৌবাহিনীর জাহাজে করে তাঁদের টেক্সাসের হিউস্টনে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়।

মহাকাশের বিস্ময়কর ছবি
মিশন চলাকালে নাসা বেশ কিছু বিস্ময়কর ছবি প্রকাশ করে। এর মধ্যে চাঁদের দিগন্তের আড়ালে পৃথিবীর অস্ত যাওয়ার 'আর্থসেট' (Earthset) ছবিটি ছিল সবচেয়ে নজরকাড়া।

এছাড়াও চাঁদ দিয়ে সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ এবং মহাকাশ থেকে পৃথিবীর উজ্জ্বল মেরুপ্রভার (অরোরা) ছবিও তুলেছেন নভোচারীরা। গত ১ এপ্রিল নাসার সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট এসএলএস-এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল আর্টেমিস-২।

চাঁদে পা রাখা কি এখনও অনেক দূরে?
আর্টেমিস-২ মিশন এক কথায় বিশাল জয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসাটা ছিল তুলনামূলক সহজ কাজ। আসল কঠিন পরীক্ষা এখন সামনে। চাঁদের মাটিতে পা রাখতে নাসার একটি শক্তিশালী ‘ল্যান্ডার’ প্রয়োজন। এর জন্য ইলন মাস্কের ‘স্পেস-এক্স’ ও জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’-এর সাথে নাসার চুক্তি রয়েছে।

তবে নাসার সাম্প্রতিক তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, স্পেস-এক্সের ‘স্টারশিপ’ রকেট নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অন্তত দুই বছর এবং বেজোসের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার আট মাস পিছিয়ে আছে। তাছাড়া, পৃথিবীর কক্ষপথে ডিপো তৈরি করে মহাকাশের শূন্যতায় হিমাঙ্কের নিচের তরল অক্সিজেন ও মিথেন স্থানান্তর করার মতো অত্যন্ত জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ নাসাকে মোকাবিলা করতে হবে।

নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতা: ট্রাম্প বনাম চীন
নাসা ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে অবতরণের লক্ষ্য স্থির করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকানদের চাঁদের মাটিতে দেখতে চান। অন্যদিকে পরাশক্তি চীন ঘোষণা দিয়েছে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী নামাবে। আর্টেমিস মিশন আরও বিলম্বিত হলে হয়তো চীনই এই প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে পারে।

মঙ্গলের স্বপ্ন কি মরীচিকা?
ইলন মাস্ক এই দশকের মধ্যেই মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর কথা বললেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন ২০৪০ সালের আগে তা অসম্ভব। ৭ থেকে ৯ মাসের দীর্ঘ যাত্রা, তীব্র মহাজাগতিক বিকিরণ এবং উদ্ধারের উপায় না থাকায় মঙ্গলের চ্যালেঞ্জ চাঁদের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

তবে সময়সূচি যাই হোক না কেন, আর্টেমিস-২ মহাকাশ গবেষণাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। নভোচারী আলেকজান্ডার গের্স্টের ভাষায়, ‘মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে মানুষের চিন্তাধারা বদলে যায়। আমরা দেখি এক ভঙ্গুর কিন্তু সুন্দর গ্রহ।’ সেই বোধটিই হয়তো একদিন মানবজাতিকে অন্য গ্রহে নিয়ে যাবে।

