২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার আগে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে পোপ লিও চতুর্দশ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং জাতিসংঘের ফিলিস্তিন-বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজের নাম। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।
নরওয়ের নোবেল কমিটি আগামী ৯ অক্টোবর ২০২৬ সালের শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করবে। এ বছর মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করা হয়েছে; এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি প্রতিষ্ঠান। তবে নোবেল কমিটি কোনো মনোনীত ব্যক্তির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে না। এসব নাম সাধারণত মনোনয়নকারীদের ঘোষণা বা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সামনে আসে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিরোধ এবারের পুরস্কার নিয়ে আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা। ইতোমধ্যে কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পকে মনোনয়ন দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব মনোনয়ন নোবেল কমিটি থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা সমর্থন বোঝায় না। নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়ন পাওয়াই কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা বা পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনার প্রমাণ নয়। এমনকি মনোনীতদের তালিকাও ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়।
পোপ লিও চতুর্দশও এবারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছেন। তিনি যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে শান্তি, সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক ফ্রান্স সফরে পোপ লিও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আলোচনায় সাহসী সমঝোতার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, বিশ্ব সত্যিকার অর্থে শান্তির দিকে এগোচ্ছে, নাকি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটি ভাবা প্রয়োজন।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক কারিম হাগাগ মনে করেন, পোপ লিও শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নীতিগত বিতর্কের একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করায় ট্রাম্পের সঙ্গে পোপের প্রকাশ্য মতপার্থক্যও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। তবে পোপের শান্তি-সংক্রান্ত বক্তব্যকে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য যোগ্যতার একটি কারণ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এর নামও ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো (পিআরআইও)-এর পরিচালক হাকন গেরলভ তার ২০২৬ সালের প্রকাশ্য তালিকায় আইসিজে ও আইসিসিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তার যুক্তি, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধ ও সংঘাত মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইসিজে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনি বিষয়ে মতামত দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে আইসিসি ব্যক্তি পর্যায়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার করে। এই দুই প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কারের আলোচনায় আনার অর্থ হবে আন্তর্জাতিক আইন, জবাবদিহি ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার গুরুত্বকে সামনে আনা এমনটাই পিআরআইও-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলনীতি নিয়ে তার কঠোর সমালোচনার কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। তবে তার সমর্থকেরা মনে করেন, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিষয়ে তার অবস্থান শান্তি ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকেরা আলবানিজের পাশাপাশি আইসিসি, আইসিজে ও পোপ লিওর নাম সম্ভাব্য আলোচ্য প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে নোবেল কমিটি শেষ পর্যন্ত এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিতে পারে, যাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্ক তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্লেষকদের আলোচনায় সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর মতো সংগঠনের নামও এসেছে। পিআরআইও-এর ২০২৬ সালের তালিকাতেও সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউক্রেনীয় শিশুদের নিয়ে কাজ করা মাইকোলা কুলেবার নাম রয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে আলোচিত নামের সংখ্যা সাধারণত অনেক বেশি হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় নরওয়ের নোবেল কমিটির পাঁচ সদস্য। মনোনয়ন শেষ হওয়ার পর কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত পুরস্কার ঘোষণার ঠিক আগে নেওয়া হয়। তাই পোপ লিও, আইসিসি, আইসিজে বা ফ্রান্সেসকা আলবানিজের নাম নিয়ে বর্তমান আলোচনা মূলত প্রকাশ্য বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য মনোনয়নসংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম জানা যাবে ৯ অক্টোবর নোবেল কমিটির ঘোষণার পর।
ইসরায়েলের নির্বাচনে কি বদলাবে গাজার চিত্র?
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ঐতিহাসিক বিজয়: আইআরজিসি
তীব্র খরায় মাটি ফেটে জেগে উঠল ২ হাজার বছরের রোমান নগরী
নূহ (আ.)-এর নৌকার খোঁজে তুরস্কে নতুন গবেষণা
ইসরায়েলগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করলো ফ্লাইদুবাই