রোমানিয়ার একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

দীর্ঘস্থায়ী তীব্র গরমে দানিউব নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় রোমানিয়া তাদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। নদীর পানি কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির দুটি চুল্লিরই শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। ফলে ইউরোপের তীব্র দাবদাহের প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত করেছে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায়।

রোমানিয়ার চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় চুল্লিটি স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) দুপুরের ঠিক আগে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর ক্ষমতা ৭০৬ মেগাওয়াট। এর আগে জুলাই মাসেই একই কারণে প্রথম চুল্লিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

কেন্দ্রটির দুটি চুল্লি মিলে রোমানিয়ার মোট বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে। তবে কেন্দ্রটির পরিচালক রোমিও উরজান জানিয়েছেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে এটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

দানিউবের পানি দিয়েই চুল্লিগুলো ঠান্ডা রাখা হয়। কিন্তু নদীর পানির উচ্চতা এতটাই কমে গেছে যে, পানি সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রের মুখ পর্যন্ত আর পর্যাপ্ত পানি পৌঁছাচ্ছে না।

পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে কর্তৃপক্ষ নদীতে পাথরবোঝাই বার্জ ডুবিয়ে কেন্দ্রটির দিকে পানির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। তাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় চুল্লিটিও বন্ধ করতে হয়েছে।

২০০৩ সালের পর এই প্রথম চেরনাভোদা কেন্দ্রের সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ হলো।

বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে দিনের বেলায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন কাজে লাগানো সম্ভব হলেও সন্ধ্যার পর কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হতে পারে রোমানিয়াকে।

শুধু পারমাণবিক বিদ্যুৎ নয়, একই পানিসংকটে রোমানিয়ার জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে একই সঙ্গে দেশের একাধিক বিদ্যুৎ উৎস চাপে পড়েছে।

প্রতিবেশী হাঙ্গেরিতেও দানিউবের পানি বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। দেশটির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও একই নদীর পানি শীতলীকরণে ব্যবহার করে। তবে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটি বন্ধ করতে হয়নি। দেশটির কর্মকর্তারা অবশ্য সতর্ক করে জানিয়েছেন, পানির উচ্চতা আরও কমে গেলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।

দানিউব ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে নদীটির পানির স্তর গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়, নৌপথ ও কৃষিতেও।

ইউরোপের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নদী রাইনেও পানির উচ্চতা কমে গেছে। এতে নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও পানিসংকটের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কও সামনে আসছে। কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বৃদ্ধির তুলনায় ইউরোপ প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ, পানির ওপর চাপ এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে।

তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের কৃষিতেও। ইতালির কৃষি সংগঠন কোলদিরেত্তির হিসাবে, শিলাবৃষ্টি, খরা ও দাবানলসহ জলবায়ুজনিত ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি ইউরোর বেশি হতে পারে।

ফ্রান্সের পরিবেশমন্ত্রী মনিক বারবু সতর্ক করেছেন, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে দেশটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।

এদিকে গ্রিসে দাবানলের কারণে শুক্রবার উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সিভিরি ও ফোরকা থেকে দুই শতাধিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের প্রায় ৮০টি বিভাগে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি রয়েছে এবং কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যেও বৃহস্পতিবার বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। লন্ডনের কিউ গার্ডেনে ৩৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রাথমিকভাবে রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।

অর্থাৎ, ইউরোপের এবারের তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু অস্বস্তিকর আবহাওয়ার সংকট নয়। নদীর পানি কমে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জলবিদ্যুৎ, নৌপরিবহন, কৃষি ও দাবানল, একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতকে চাপে ফেলছে অতিরিক্ত উষ্ণতা। সূত্র: বিবিসি

AS
আরও পড়ুন