পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে লংমার্চ প্রত্যাহার করে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান করা সম্ভব। একই সঙ্গে লংমার্চ ও বিক্ষোভ দেশের অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ইসলামাবাদে কাশ্মীর চকের আন্ডারপাস নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় শেহবাজ শরিফ এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আবারও লংমার্চের আশঙ্কা তৈরি হওয়া দুঃখজনক। পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছিল বলেও জানান তিনি।
শেহবাজ বলেন, জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকের কক্ষে দুই দিন দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। তখন আশা করা হয়েছিল, রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবেশের অবসান হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তার দাবি, আলোচনাকে সফল হতে না দেওয়াই পিটিআইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এবং তারা আগে সমঝোতা হওয়া বিষয়গুলোতেও পরিবর্তন দাবি করেছে।
পিটিআইয়ের এই লংমার্চের মূল দাবি কারাবন্দি দলীয় প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি। কেন্দ্রীয় সরকার ইসলামাবাদে কোনো ধরনের জমায়েত ঠেকানোর ঘোষণা দেওয়ার পরও বিরোধী দলটি কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
শেহবাজ শরিফ বলেন, বিক্ষোভ ও লংমার্চের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। এতে আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। তার দাবি, গত আড়াই বছরে সরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়েছে এবং এখন অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং দেশের উৎপাদন, সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। কেউ যদি এই অগ্রগতিতে ক্ষতি করে, তাহলে সেটিকে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ হিসেবে দেখা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত করা এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানিয়েছেন, পিটিআই লংমার্চ ও বিক্ষোভ প্রত্যাহার না করলে সরকারের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা হবে না। ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পিটিআইয়ের কর্মসূচি মোকাবিলায় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে। আলোচনার পথ খোলা থাকলেও রাজনৈতিক সমাধানই সরকারের প্রথম পছন্দ বলে জানান তিনি।
আলোচনা ভেঙে যাওয়ার জন্য খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিকে দায়ী করেন তালাল। তার দাবি, পিটিআইয়ের আলোচক দলের কয়েকজন নেতা সমঝোতার চেষ্টা করলেও শেষ মুহূর্তে খাইবার পাখতুনখাওয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শের পর তারা চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া থেকে সরে যায়।
তালাল জানান, আলোচনার প্রথম দিনে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। পরদিন পিটিআইয়ের প্রতিনিধিদল পেশোয়ারে প্রাদেশিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে আবার ইসলামাবাদে ফিরে আসে। তার দাবি, প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে আলোচক দলকে সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
তালালের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়ে পিটিআই কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়েছিল। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি লাহোরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজকে বিষয়টি জানান। প্রধানমন্ত্রী তখন আলোচনায় পিটিআইকে যতটা সম্ভব রাজনৈতিক পরিসর দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানান তালাল।
তার দাবি, দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হওয়ার পর সমঝোতার খসড়া তৈরি করা হয়। রাত ৯টার মধ্যে খসড়াটি প্রস্তুত হয়ে যায়। পরে আরও কিছু সংশোধন নিয়ে আলোচনা হলেও সেগুলোও সমঝোতার ভিত্তিতে মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিটিআইয়ের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে গিয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং এরপর আলোচনাস্থল ত্যাগের অনুমতি চান।
তালাল বলেন, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী দুটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে ঐকমত্য রয়েছে। এর দ্বিতীয় কর্মপরিকল্পনাটি ইমরান খানের সরকারের সময়েও গৃহীত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এসব কর্মপরিকল্পনা পাকিস্তানের সংবিধান, জাতীয় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও পিটিআইকে প্রশ্ন করেন তালাল। তার দাবি, প্রদেশটিতে সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদদের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও পিটিআইয়ের নেতাকর্মীরা সেখানে তুলনামূলক নিরাপদে রয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পিটিআইয়ের প্রতি কোনো বিশেষ সুবিধাজনক সম্পর্ক রয়েছে কি না।
এদিকে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত দুই দফা আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় খাইবার পাখতুনখাওয়ার ভূমিকা এবং ইমরান খানের সঙ্গে পিটিআই নেতাদের সাক্ষাতের সুযোগ, এই দুই বিষয় আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পিটিআই দাবি করে, দলীয় প্রধান ইমরান খানের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছিল তারা এবং তার সঙ্গে সাক্ষাতের বিনিময়ে অন্য দাবিগুলোও ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল। তবে সরকার প্রস্তাবিত সমঝোতায় ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়নি বলে অভিযোগ করে দলটি।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্র ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার সরকারের ভূমিকা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশটির সরকারের কাছে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপে সহযোগিতা এবং সংযুক্ত উপজাতীয় জেলাগুলোতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। অন্যদিকে পিটিআই দুই সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধিদের বৈঠকের মাধ্যমে শান্তি ও সন্ত্রাস দমনে একটি সমন্বিত কৌশল তৈরির প্রস্তাব দেয়।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার জন্য দায়ী করেন। একই সময়ে প্রদেশটিতে গভর্নরের শাসন জারির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী রানা সানাউল্লাহ জানান, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে বিরোধী পক্ষ থেকে ইতিবাচক অগ্রগতির নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে আবারও আলোচনায় বসা সম্ভব।
তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, পিটিআইকে আগে লংমার্চ ও বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে হবে। এরপরই নতুন করে রাজনৈতিক সংলাপের পথ খুলতে পারে বলে জানিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সূত্র: ডন
ইরাককে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাতে চেয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র: নিকজাদ
কঙ্গোতে দুই নৌকার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩০
সৌদির আভা বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা হুথিদের
মহাসাগর থেকে সব মার্কিন জাহাজ পালিয়ে গেছে: আইআরজিসি উপদেষ্টা