নেপালে সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্যের উৎস খুঁজে বের করার কথা বলে কয়েকটি গণমাধ্যমের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সাংবাদিকদের আটক করেছে পুলিশ। তবে তাদের আটকের কারণ স্পষ্ট করেনি পুলিশ।
এ ঘটনায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক সংগঠন ও সুশীল সমাজ। সমালোচকদের মধ্যে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিও (আরএসপি) রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, কোনো সংবাদ প্রকাশ নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা পুলিশের হস্তক্ষেপে নয়, নেপাল প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। শুক্রবার বিকেলে পুলিশ ‘নেপাল প্রেস’-এর বিশ্বমণি সুবেদি, ‘মোটিভ নিউজ’-এর সম্পাদক শোভরাজ বারাল এবং ‘ডিএনএ খবর’-এর প্রধান সম্পাদক ধীরাজ বাসনেতকে আটক করে।
এ ছাড়া ‘নয়া পত্রিকা ডেইলি’র কার্যালয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করে সাংবাদিক নবরাজ মাইনালিকে আটক করার চেষ্টা চালায় পুলিশ। তবে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে রাত আটটার দিকে তারা সেখান থেকে চলে যায়। একই দিন পুলিশের আরেকটি দল আনামনগরে ‘দিয়ো পোস্ট’-এর কার্যালয়েও যায়। তবে প্রধান সম্পাদক সুদীপ বিশ্বকর্মাকে না পেয়ে ফিরে আসে।
সাংবাদিকদের আটকের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ফেডারেশন অব নেপালি জার্নালিস্টস। সংগঠনটির সভাপতি নির্মলা শর্মা বলেন, গণমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তু করতে পুলিশকে ব্যবহার করা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন।
তিনি আরো বলেন, ‘এ ঘটনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে কিছু জানে না বলে দায় এড়াতে পারে না। এর পেছনে সরকারের হাত না থাকলেও গণমাধ্যমের কাজে এই হস্তক্ষেপের জন্য কারা দায়ী, তা খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু একটি বিবৃতি দিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারে না।’
নির্মলা শর্মা বলেন, সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে পুলিশের প্রবেশ ২০০৫ সালে রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের ক্ষমতা দখলের সময়কার স্বৈরাচারী শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ফেডারেশন অব নেপালি জার্নালিস্টসের সাবেক সভাপতি শিব গাওনলেও পুলিশি অভিযানের সমালোচনা করেছেন। তিনি ‘কান্তিপুর’ পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশ যেভাবে গণমাধ্যমের কার্যালয়ে ঢুকে সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্যের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে, তা আমাদের জ্ঞানেন্দ্র শাহের শাসনামলের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
তার মতে, সাংবাদিকদের তথ্যের উৎস জানার জন্য আটক করা সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার লড়াই শুরুর আগেই আমাদের সংবিধান রক্ষার জন্য লড়তে হচ্ছে।’
যে প্রতিবেদন ঘিরে বিতর্ক
কাঠমান্ডু ভ্যালি ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসের একটি দল প্রথমে নতুন বানেশ্বরে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘নেপাল প্রেস’-এর কার্যালয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমটির প্রধান সম্পাদক মাত্রিকা পাউডেল জানান, সাদা পোশাকে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা প্রথমে বিশ্বমণি সুবেদির কাছে গিয়ে বলেন, তারা তাঁর এক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। সুবেদি কার্যালয়ের বাইরে এলে কর্মকর্তারা তাকে নিজেদের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান। তখন অন্য সাংবাদিকেরা বুঝতে পারেন, তাকে আটক করা হচ্ছে।
এক পুলিশ কর্মকর্তা ‘কান্তিপুর’ পত্রিকাকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমরা তিনজনকে ডেকেছিলাম।’
সুবেদি যে সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন, সেই ‘নেপাল প্রেস’ গত ২৮ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দাবি করা হয়, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সচিবালয় নেপাল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) দান বাহাদুর কার্কিকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছে। তিনি পদত্যাগে রাজি না হলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কার্কির সঙ্গে অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্তের মুখে থাকা ইনাম সাপকোটার যোগাযোগকে এ চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কার্কির নেতৃত্ব নিয়ে সরকারের অসন্তোষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ওই বৈঠকে কাঠমান্ডুতে কর্মরত জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার ও ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেলসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল করা বা বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ‘নয়া পত্রিকা’ ইনাম সাপকোটা ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হরি ফুয়ালের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে হওয়া কথোপকথন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, সাপকোটা একটি রিট আবেদন খারিজ করার জন্য বিচারপতিকে অনুরোধ করেন। এ সময় তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ অনুরোধ করেছেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর ব্যাংকিং অপরাধে অভিযুক্ত রোহিত গুপ্তের পক্ষে করা অবৈধ আটকসংক্রান্ত রিটের শুনানির আগে সাপকোটা বিচারপতিকে লেখেন, ‘স্যার, দয়া করে এটি খারিজ করে দিন।’ পরে বিচারপতি ফুয়াল তার সঙ্গে হোটেল হিমালয়ে দেখা করার প্রস্তাব দেন।
অন্যদিকে ‘দিয়ো পোস্ট’ একটি নথি প্রকাশ করে, যেখানে প্রধান বিচারপতি মনোজ কুমার শর্মা ও ক্ষমতাসীন আরএসপির আইনপ্রণেতা বিশ্বরাজ পোখারেলের নাম রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাপকোটার ফোন থেকে উদ্ধার করা ওই নথিতে আর্থিক লেনদেনের হিসাব ছিল। এতে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের সিলও ছিল। তবে নথি প্রকাশের পর শর্মা ও পোখারেল পৃথক বিবৃতিতে সাপকোটার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেন। ‘মোটিভ নিউজ’ও কার্কি ও সাপকোটাকে নিয়ে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
পুলিশের পদক্ষেপের নিন্দা ক্ষমতাসীন দলের
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আরএসপি। দলটির মুখপাত্র জগদীশ খারেল বলেন, ‘যে অজুহাতেই হোক, গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো, মানসিক চাপে রাখা বা তাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।’
দলটি আরো বলেছে, পুলিশকে ব্যবহার করে স্বাধীন গণমাধ্যমকে আতঙ্কিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সাংবাদিকদের আটকের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী বা তার কার্যালয়ের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এ বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানানোও হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট কো-অর্ডিনেটর দীপা দাহাল বলেন, ঘটনা জানার পর প্রধানমন্ত্রী আটক সাংবাদিকদের দ্রুত মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের কার্যালয়ে প্রবেশ না করতে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
প্রেস কাউন্সিলের উদ্বেগ
নেপাল প্রেস কাউন্সিলও এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কাউন্সিল জানায়, সাংবাদিকদের আটকের কারণ স্পষ্ট করা হয়নি, কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি এবং আদালতের অনুমোদনের বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি।
কাউন্সিলের সভাপতি উমেশ শ্রেষ্ঠা ‘কান্তিপুর’ পত্রিকাকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের বিবৃতিতে সংবাদ প্রতিবেদন ও মন্তব্যের বিষয়ে তদন্ত এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এর পরদিনই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রেস কাউন্সিল আইন’ অনুযায়ী, প্রকাশিত সংবাদ বা সাংবাদিকদের পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব প্রেস কাউন্সিলের। তাই পুলিশের এ ধরনের আচরণ অনুচিত।
কলকাতায় হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা
ইরাকে মার্কিন ডলারের দরপতন
দাসপ্রথার জন্য ক্ষমা চাইতে রাজি, ক্ষতিপূরণ দিতে নয়: বার্নহাম
হরমুজের কাছে দ্বিতীয় মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন জব্দ আইআরজিসি'র
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে: সারজিস