গত ১২ বছরে ভারতে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে চরম দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। তবে দারিদ্র্য কমার এই অগ্রগতির পাশাপাশি আয় ও সম্পদের বৈষম্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আলজাজিরার ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে দারিদ্র্য কমানোর এই অগ্রগতিকে বিশ্বব্যাংক ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের জন্য নির্ধারিত দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ২০১১ সালের ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ১৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। এতে আনুমানিক ৪৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ওই দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছে।
তবে এই সাফল্যের বিপরীতে ভারতের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। বিপরীতে, নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের ভাগে রয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের দারিদ্র্য কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভোগব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে অগ্রগতি এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর থেকেই ভারতে দারিদ্র্য কমার প্রবণতা শুরু হয়। পরবর্তী সরকারগুলো বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি চালু ও সম্প্রসারণ করেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সময়ে গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচি চালু হয়। এর আওতায় গ্রামীণ পরিবারগুলোকে বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদি সরকার সরাসরি নগদ সহায়তা, বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ ও আবাসন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৮০ কোটি মানুষ সরকারি খাদ্যশস্য সহায়তা পাচ্ছে।
গ্রামীণ এলাকায় শৌচাগার নির্মাণ এবং নিরাপদ পানির সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগও দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে গ্রামীণ পরিবারের মাত্র ১৭ শতাংশে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির সংযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ৮০ শতাংশের বেশি হয়েছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ ভাল্লা ও করণ বাসিন উল্লেখ করেন, নিরাপদ পানির সুযোগ বাড়লে পানিবাহিত রোগ কমতে পারে। এতে পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা কমে এবং আয় করার সুযোগ বাড়ে।
দারিদ্র্য কমার পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও সরকারি খাদ্যসহায়তার কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ ভাল্লা ও করণ বাসিনের মতে, ৮০ কোটি মানুষের জন্য বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ মূলত ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে। পুষ্টির ঘাটতি কমাতে খাদ্যসহায়তা আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রকৃত দরিদ্রদের লক্ষ্য করে দেওয়া প্রয়োজন।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন বিনা মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা সরকারের পক্ষে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তার ওপর এত মানুষের নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার অন্য কোনো সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা প্রশ্ন তুলেছেন, দেশটি কেন নিজস্ব দারিদ্র্যসীমা ও দারিদ্র্যের হিসাব নির্ধারণ করছে না। তাঁর দাবি, ২০১৪ সালের পর ভারত সরকার নিজস্ব দারিদ্র্য পরিমাপের হিসাব বন্ধ করে বিশ্বব্যাংকের অনুমানের ওপর নির্ভর করছে।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুরজিৎ ভাল্লা বিশ্বব্যাংকের হিসাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি ও হিসাব প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর গবেষক এবং সরকারের মাধ্যমে যাচাই করা হয়।
আয়বৈষম্য, বেকারত্ব ও স্থবির মজুরি
দারিদ্র্য কমলেও ভারতের মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষের মতে, দেশটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি সরকারি স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় অংশ নাগরিকদের নিজেদের বহন করতে হয়। এতে বহু পরিবার দারিদ্র্য বা ঋণের ঝুঁকিতে পড়ে।
জয়তী ঘোষ আরও বলেন, ভারতে প্রকৃত মজুরি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় স্থবির। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি আয় করা ১০ শতাংশ কর্মীর মধ্যম উপার্জন সবচেয়ে কম আয় করা ১০ শতাংশ কর্মীর তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক নীতিন কুমার ভারতী বলেন, দারিদ্র্য কমার পরিসংখ্যান উৎসাহব্যঞ্জক হলেও একে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর হিসাবে, দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে এখনো ২৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করছে।
বিশ্ব বৈষম্য ল্যাবের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় ভারতের আয় ও সম্পদের বৈষম্যের বিষয়টি উঠে আসে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে সম্পদ ও জাতীয় আয়ের বড় অংশ জমা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোট দিয়েছেন প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ
শেখ হাসিনা-কামালের সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণে নিতে চিঠি, কী কী আছে তাদের
মাদরাসায় হামলা-ভাঙচুর: রুমীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ
এমপি পুত্রের সারের ডিলার নিয়োগ বাতিল চেয়ে ডিসির কাছে আবেদন
জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে এনসিপি