আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৩ এএম

ইসলামকে বলা হয় দ্বীন বা পথ। আর প্রতিটি পথেরই আছে একটি গন্তব্য। শান্তি, আল্লাহর নৈকট্য এবং পরকালে জান্নাত, এই তিন আকাঙ্ক্ষাই একজন মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে শুধু পথে দাঁড়িয়ে থাকলেই হয় না; এগোতে হয়, চেষ্টা করতে হয়, বদলাতে হয় নিজেকে।

ইসলামকে অনেক সময় একটি পথ বা জীবনব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই পথের শেষে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরশান্তির আবাস জান্নাত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো পথই কাজে আসে না, যদি মানুষ সেই পথে হাঁটা শুরু না করে।

অনেক নব মুসলিম, এমনকি জন্মসূত্রে মুসলিমদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে, শুধু ইসলাম মেনে নিলেই জীবন আপনা-আপনি সহজ ও সুন্দর হয়ে যাবে। অথচ প্রকৃত পরিবর্তন আসে যখন মানুষ সচেতনভাবে সেই পথে চলতে শুরু করে।

ইসলামী জীবনযাপন, আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলা, এই চলার প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে জীবনকে সহজ করে তোলে, অনেক সময় বিস্ময়করভাবে বদলেও দেয়। কিন্তু এর জন্য দরকার ব্যক্তিগত চেষ্টা ও অগ্রগতি। শুধু পথে দাঁড়িয়ে থাকলে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।

আল্লাহর নৈকট্য শুধু আধ্যাত্মিক অনুভূতির বিষয় নয়, বরং মানুষের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যও বটে। কোরআনে বলা হয়েছে, আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।

এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারলেই মানুষের অন্তরে আসে গভীর তৃপ্তি। জীবন তখন অর্থবহ হয়ে ওঠে, মনে প্রশান্তি আসে।

তবে প্রশ্ন হলো, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কীভাবে এগোতে হবে? কীভাবে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে? কীভাবে অন্তরে সেই শান্তি পাওয়া যাবে?

সীমানা নির্ধারণ

যেকোনো সম্পর্কের জন্য সীমানা বা সীমারেখা থাকা জরুরি। সীমা না থাকলে সম্পর্ক টেকে না। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের সীমানা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তার সঙ্গে কাউকে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য গুনাহ যাকে চান ক্ষমা করেন।

আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা শুধু পথচলাই থামিয়ে দেয় না, বরং মানুষকে পুরো পথ থেকেই বিচ্যুত করে দেয়। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তার জায়গায় অন্য কিছুকে বসানো মানে সবচেয়ে বড় সীমা লঙ্ঘন করা।

যেকোনো সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসে আল্লাহর গুণাবলী ও নামগুলো জানার মাধ্যমে মানুষ তার মহিমা উপলব্ধি করতে পারে, অন্তরে গভীর শ্রদ্ধা জন্মায়।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা মানুষের ইবাদতের উৎকর্ষতার একটি লক্ষণ।

ভরসা বা তাওয়াক্কুল

দীর্ঘস্থায়ী কোনো সম্পর্কই বিশ্বাস ছাড়া টিকে না। আল্লাহর ওপর ভরসাই ঈমানের ভিত্তি। বিশ্বাস যে তিনি রিজিক দেবেন, ক্ষমা করবেন, সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।

কোরআনে বলা হয়েছে, যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

এই ভরসার অর্থ হলো, জীবন আমাদের পরিকল্পনামতো না চললেও আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা না রাখা। কষ্ট এলে ধৈর্য ধারণ করলে সওয়াব পাওয়া যাবে, সুখের সময় কৃতজ্ঞ হলে সওয়াব পাওয়া যাবে।

যোগাযোগ

কোনো সম্পর্কই যোগাযোগ ছাড়া টেকে না। দশ বছর কথা না হলে যেমন বন্ধুত্ব থাকে না, তেমনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও নিয়মিত যোগাযোগ ছাড়া দৃঢ় হয় না।

নামাজ হলো সেই দৈনিক যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দিনে অন্তত পাঁচবার বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কথা শোনে, আর দোয়ার মাধ্যমে নিজের কথা জানায়।

সচেতনতা বা তাকওয়া

যাকে ভালোবাসা হয়, তাকে মনে রাখা হয় সব সময়। আল্লাহর ক্ষেত্রে এই সচেতনতাকেই বলা হয় তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ও ইসলামী বিধান সম্পর্কে সচেতন জীবন।

যখন মানুষ আল্লাহকে স্মরণে রাখে, তখন তার চিন্তা ও কাজে সেই প্রভাব পড়ে। সে ফরজ পালন করে, অন্যায় ও হারাম থেকে দূরে থাকে।

এই কয়েকটি অভ্যাসই মানুষকে আল্লাহর পথে এগিয়ে নেয়, দেয় অন্তরের শান্তি।

সবচেয়ে ভরসার কথা হলো, বান্দা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে এগোতে চায়, আল্লাহ তার চেয়েও বেশি এগিয়ে আসেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, বান্দা যদি এক কদম এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে যাই; সে যদি হেঁটে আসে, আমি দৌড়ে যাই।

এই প্রতিশ্রুতিই প্রমাণ করে, আল্লাহর সান্নিধ্যের পথ কষ্টের হলেও কঠিন নয়। এই পথে আল্লাহ বান্দাকে একাকী ছেড়ে দেন না। যারা সত্যিই চেষ্টা করে, তাদের জন্য সেই পথ হয়ে ওঠে শান্তি ও ঈমানের যাত্রা।

HN
আরও পড়ুন