বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল ও ব্যর্থ

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিতে যাচ্ছে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এক অস্থির সময়ে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকারের দেড় বছরের শাসনামল নিয়ে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা। তিনটি মূল লক্ষ্য—রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন—নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের ঝুলিতে যেমন রয়েছে বড় সাফল্য, তেমনি রয়েছে অমীমাংসিত নানা বিতর্ক ও ব্যর্থতার গ্লানি।

সরকারের তিন মূল স্তম্ভ ও সাফল্যের দাবি
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা তাদের ঘোষিত তিন লক্ষ্যেই সফল। বিশেষ করে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করাকে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২৫টি রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ এবং ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য পৌঁছানোকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সরকার বড় ধরনের অগ্রগতি দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি গুম ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনাকেও সরকার ইতিবাচক অর্জন হিসেবে দেখছে।

অর্থনীতির অম্লমধুর চিত্র
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার স্থিতিশীলতা ফেরাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দায়িত্ব গ্রহণের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৫টি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল মূল্যস্ফীতি। গত ২০২৫ সালজুড়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭৭ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। চালের দাম ও খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি সফল হতে পারেনি বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

সংস্কার বনাম পথভ্রম: বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সংস্কার কমিশন গঠন ইতিবাচক হলেও এটি ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ বা খামখেয়ালিপনার শিকার হয়েছে। তার মতে, শিক্ষাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনই গঠিত হয়নি। 

অন্যদিকে, বিচারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “বিচার নাকি প্রতিশোধ—সেই প্রশ্ন তোলার সুযোগ সরকার নিজেই তৈরি করেছে।” ঢালাও হত্যা মামলায় শিক্ষক ও সাংবাদিকদের জড়ানো এবং প্রশ্নবিদ্ধভাবে অনেককে আটকে রাখাকে তিনি সরকারের একটি বড় বিচ্যুতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

মব সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার সংকট
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়েই ‘মব জাস্টিস’ বা মব সন্ত্রাস ছিল এক বড় আতঙ্ক। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা, মাজার ভাঙচুর এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরকারের কঠোর অবস্থান না নেওয়াকে বিশ্লেষকরা ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। 

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, গত ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা এবং নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো জনমনে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।

নারী অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা
অধ্যাপক ইউনূস নিজে নারীদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। নারী সংস্কার কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে নারীদের হেনস্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নারীর সমতার ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এই সরকারের আমলেই এসেছে। তার মতে, সরকার উগ্র শক্তির কাছে নতি স্বীকার করায় মুক্তিযুদ্ধ ও বাক-স্বাধীনতার মৌলিক চেতনাগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, সরকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক (নির্বাচনের দিকে যাওয়া) ক্ষেত্রে সফলতা দেখালেও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সংহতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যেভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

সব মিলিয়ে, একটি অবাধ নির্বাচনের আয়োজন এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকিয়ে দেওয়া এই সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মব সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়ভারও এই সরকারকে বহন করতে হবে।

DR/SN
আরও পড়ুন