দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে সরব থাকলেও দেশটির সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে আসছিল ইসরায়েল। তাদের আশঙ্কা ছিল, তেহরানের রাজনৈতিক মিত্র ও লেবাননের প্রক্সি বাহিনী হিজবুল্লাহ ইরানের হয়ে পাল্টা আঘাত হানবে। তাদের ছোড়া হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেটের আগুনে হাইফা ও তেল আবিব লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে।
তবে চলমান সংঘাতে ইরানের আকাশসীমা এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। তারা একে একে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অবকাঠামো ও অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করে চলেছে।
ইরান আসলেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল কি না, সেই আলাপ এখন আর খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
— শিরা এফ্রন, ইসরায়েল–বিষয়ক বিশ্লেষক, র্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান
গত রোববার দিবাগত রাত একটার দিকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে একটি প্রতীকী ও তুলনামূলক দুর্বল রকেট ও ড্রোন হামলার পর ইসরায়েল কাঙ্ক্ষিত অজুহাত পেয়ে যায়। তারা তাৎক্ষণিক বৈরুতসহ লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহ নেতাদের লক্ষ্য করে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত এক বড় ধরনের পাল্টা অভিযানের ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বের কারণে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইসরায়েল নিজের সামরিক শক্তির প্রভাব বুঝতে পারছে এবং দুই প্রধান শত্রুর দুর্বলতা টের পাচ্ছে। এই নতুন যুদ্ধকে দেশটি নিজেদের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে নিয়েছে।
সোমবার ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে ডিভিশন কমান্ডারদের উদ্দেশে দেশটির সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, ‘আমরা এই অভিযান এমনভাবে শেষ করব, যেখানে শুধু ইরানকেই আঘাত করা হবে না; বরং হিজবুল্লাহও এক বিধ্বংসী ধাক্কার সম্মুখীন হবে।’ হিজবুল্লাহর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরও বলেন, লেবানন থেকে আসা হুমকি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এটি থামবে না।
ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করেছে অনেকটা সুযোগ বুঝে। আর এই বিষয়টি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর দেশটির কৌশলগত চিন্তাধারায় একটি বড় পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। শোচনীয় গোয়েন্দা ব্যর্থতার ফলে ওই হামলা চালানো সম্ভব হয়েছিল।
ইসরায়েল এখন আর তার শত্রুদের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখছে না। তাই ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে তৎপর শত্রুরা যখন সক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করছে, তখন সুযোগ পেলেই সেসব সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়াকে এখন অপরিহার্য মনে করছে দেশটি।
ইরানে শনিবারের ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রধান যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান র্যান্ডের ইসরায়েল–বিষয়ক বিশ্লেষক শিরা এফ্রন বলেন, ইরান আসলেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল কি না, সেই আলাপ এখন আর খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
হামলার পরিকল্পনা এক বছর আগের
ইসরায়েলের তিনজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মতে, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ইরানের ওপর এককভাবে হামলার পরিকল্পনা শুরু করতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বছরের শেষ দিকে সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, সামরিক কমান্ডাররা শুরুতে এই পরিকল্পনায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। কারণ, তারা বিশ্বাস করতেন না যে এককভাবে লড়ে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করা সম্ভব। এ ছাড়া ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলের জনবহুল এলাকাগুলো রক্ষা করার সক্ষমতা নিয়েও তারা চিন্তিত ছিলেন।
তবে দুজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, যখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইরানের ওপর হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে অংশ নেবে এবং এই অঞ্চলে তারা সেনা সমাবেশ শুরু করেছে, তখন ইসরায়েলি জেনারেলরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। তাঁরা ইরানকে লন্ডভন্ড করে দেওয়া, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ধ্বংস করা, পারমাণবিক কর্মসূচির আরও ক্ষতি করা, এমনকি ইরান সরকারকে পতনের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে এটিকে লুফে নেন।
ইসরায়েলি দুজন কর্মকর্তার মতে, মাঝআকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিশাল এক ট্যাংকার বহর পাঠানোসহ যুদ্ধের বড় একটি অংশের ভার যুক্তরাষ্ট্র কাঁধে নেওয়ায় শনিবার ইসরায়েলের পক্ষে তাদের ইতিহাসের বৃহত্তম বিমানবহর মোতায়েন করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে বিধ্বংসী হামলা চালানো গেছে বলে তাঁরা জানান।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এ অভিযান মূলত কয়েক মাস আগের নেওয়া পরিকল্পনারই অংশ, যা বাস্তবায়নের জন্য তারা কেবল একটি অজুহাতের অপেক্ষায় ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শিমন শাপিরা অনেক বছর ধরে হিজবুল্লাহকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, এ নতুন অভিযানের লক্ষ্য হওয়া উচিত গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া। তিনি আরও বলেন, ‘লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহকে একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত করা, যাদের কোনো অস্ত্র বা সেনাবাহিনী থাকবে না। আপনি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিতে পারেন এবং সেই কাজটি করতে গিয়ে তাদের কমান্ডারদের হত্যা করতে পারেন।’
সোমবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি ও ইরানিদের আশ্বস্ত করে বলেন, সেই দিন ঘনিয়ে আসছে, যখন ইরানের জনগণ ‘স্বৈরাচারের কবল’ থেকে মুক্তি পাবেন। আর যখন সেই দিন আসবে, তখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের পাশে থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি নেতারা যদি দুই ফ্রন্টের এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং এই অঞ্চলের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উল্লসিত থাকেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। গাজা যুদ্ধ বাদে গত কয়েক বছরে ইসরায়েল সামরিকভাবে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশটি সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের প্রক্সি বাহিনীকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা কাটিয়ে বারবার গোয়েন্দা সাফল্য পেয়েছে ও বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়েছে।
তবে দেশটির এ দম্ভপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। র্যান্ডের বিশ্লেষক এফ্রন বলেন, ইসরায়েলের মনে রাখা উচিত কেবল যুদ্ধ নয়, রাজনৈতিক সমঝোতারও প্রয়োজন আছে।
এফ্রন বলেন, এক কোটি মানুষের একটি দেশ যদি মনে করে যে কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা পুরো অঞ্চলের খোলনলচে বদলে দেবে, তবে সেটি একটু বাড়াবাড়িই হবে। কেউ ইরানকে পছন্দ করে না, তার মানে এই নয় যে ইসরায়েলের জবরদস্তিমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য হবে।
অভিনন্দন জানানো বিলবোর্ড-ব্যানার সরানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
