চীনের কমিউনিস্ট সরকার দেশটিতে ‘জাতিগত ঐক্য ও প্রগতি’ (Promoting Ethnic Unity and Progress) নামক একটি নতুন আইন চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহে চীনের বার্ষিক সংসদীয় অধিবেশনে এই আইনটি অনুমোদিত হওয়ার কথা রয়েছে। মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আইনটি মূলত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করবে এবং তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘হান’ সংস্কৃতির সাথে জোরপূর্বক মিশিয়ে দেওয়ার (Assimilation) প্রক্রিয়াকে আইনি বৈধতা দেবে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই ‘ধর্মের চীনাযায়ন’ (Sinicisation of religion) এবং জাতীয় সংহতির ডাক দিয়ে আসছেন। প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে বেশ কিছু কঠোর ও সুদূরপ্রসারী বিধান রাখা হয়েছে:
১. মান্দারিন ভাষার একক আধিপত্য: সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় ভাষার মর্যাদা কমিয়ে রাষ্ট্রভাষা মান্দারিন শিখতে বাধ্য করা হবে।
২. আন্তঃজাতি বিবাহে উৎসাহ: সংখ্যাগরিষ্ঠ হান চীনাদের সাথে সংখ্যালঘুদের বিবাহকে উৎসাহিত করা হবে। কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি এই ধরনের বিবাহে বাধা দিতে পারবে না। বিশ্লেষকরা একে সংখ্যালঘু রক্তধারা ও সংস্কৃতিকে ‘হান’ সংস্কৃতির গর্ভে বিলীন করার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
৩. পার্টির প্রতি আনুগত্য: অভিভাবকদের আইনিভাবে বাধ্য করা হবে যেন তারা তাদের সন্তানদের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অনুগত থাকতে এবং দলের আদর্শকে ভালোবাসতে শিক্ষা দেন।
৪. অস্পষ্ট ‘একতা’র সংজ্ঞা: ‘জাতিগত ঐক্যের’ ক্ষতি করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ‘ক্ষতি’র সংজ্ঞা অস্পষ্ট হওয়ায় এটি ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের একটি হাতিয়ার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশই হান জাতির হলেও তিব্বতি, উইঘুর ও মঙ্গোলীয়দের মতো ৫৫টি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে। বেইজিং এই গোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ করে শিনজিয়াং এবং তিব্বতের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে মনে করে। ২০০৮ সালে তিব্বতের লাসায় এবং ২০০৯ সালে শিনজিয়াংয়ের উরুমকিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর থেকে চীন এই অঞ্চলগুলোতে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে যে, শিনজিয়াংয়ে ১০ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলিমকে ‘পুনঃশিক্ষা’ বা ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি রাখা হয়েছে। তিব্বতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং মঠগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
কেন চীন এই এলাকাগুলোতে এত কঠোর নিয়ন্ত্রণ চায়? এর কারণ হলো তিব্বত, শিনজিয়াং এবং ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চলগুলো প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এগুলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। চীনের মোট ভূখণ্ডের একটি বিশাল অংশ এই সংখ্যালঘুদের আদি নিবাস। চীন চায় এই অঞ্চলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্ছিদ্র করতে এবং ‘হান’ জনসংখ্যা বাড়িয়ে সেখানকার জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিতে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর গবেষক ইয়াল্কুন উলুয়ল বলেন, ‘এই আইনটি শিক্ষা, ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যমজুড়ে ‘চীনা জাতির সাধারণ চেতনা’র একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করে দিচ্ছে।’ অন্যদিকে, ‘ক্যাম্পেইন ফর উইঘুরস’ জানিয়েছে, এই আইনের ফলে উইঘুর, তিব্বতি ও মঙ্গোলীয়রা আর তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে না।
চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের মুখপাত্র লো কিনজিয়াং দাবি করেছেন, এই আইনের লক্ষ্য হলো জাতিগত বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সাথে আরও ভালোভাবে একীভূত করা। তাদের মতে, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো ‘অনগ্রসর’ এবং তাদের আধুনিকায়নের জন্য এই একীভূতকরণ জরুরি।
তবে সমালোচকদের মতে, আধুনিকায়নের নামে চীন মূলত ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার বিলুপ্তি ঘটিয়ে এক রঙের ‘চীনা পরিচয়’ তৈরি করতে চাইছে, যেখানে কোনো স্বতন্ত্র সংস্কৃতি বা ধর্মের স্থান নেই।
উইঘুর মুসলিম হত্যার বিচার আইসিসিতে করার আহ্বান
উইঘুর নির্যাতন: জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত দাবি
