বর্তমান ক্রীড়াবিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং জনপ্রিয় আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ (FIFA World Cup)। যাকে এক নামে সবাই চেনে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে। প্রতি চার বছর পর পর এই একটি টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে পুরো পৃথিবী যেন মেতে ওঠে ফুটবল উন্মাদনায়। কিন্তু বর্তমানের এই জমকালো ও কোটি ডলারের টুর্নামেন্টটির শুরুটা কেমন ছিল?
আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে এক রোমাঞ্চকর এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল এই ফুটবল বিশ্বকাপের।
চলুন ফিরে যাওয়া যাক ১৯৩০ সালে, ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই শুরুর দিনগুলোতে—
অলিম্পিকের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন স্বপ্ন
১৯২০-এর দশক পর্যন্ত ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক আসর বলতে ছিল অলিম্পিক গেমস। তবে অলিম্পিকের কঠোর নিয়ম ছিল—সেখানে কেবল ‘অপেশাদার’ বা শৌখিন ফুটবলাররাই অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু ততদিনে ফুটবল বিশ্বে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া লেগে গেছে। এই জটিলতা দূর করতে এবং ফুটবলের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি বিশ্বমঞ্চ তৈরি করতে এগিয়ে আসেন ফিফার (FIFA) তৎকালীন ফরাসি সভাপতি জুলে রিমে। তাঁর একক প্রচেষ্টা ও দূরদর্শিতাতেই মূলত ফুটবল বিশ্বকাপের ধারণা বাস্তব রূপ পায়। ১৯২৮ সালের ফিফা কংগ্রেসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—১৯৩০ সালে বসবে বিশ্বকাপের প্রথম আসর।
প্রথম আয়োজক উরুগুয়ে এবং শতবর্ষের উৎসব
প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল দুটি—প্রথমত, উরুগুয়ে তখন অলিম্পিক ফুটবলের টানা দুইবারের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। দ্বিতীয়ত, ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্ণ হতে যাচ্ছিল। এই আসরকে স্মরণীয় করতে উরুগুয়ে সরকার অংশ নেওয়া দলগুলোর যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার সমস্ত খরচ বহনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়।
আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দুই সপ্তাহের ক্লান্তিকর জাহাজ যাত্রা
আজকের দিনে ফুটবলাররা যেখানে বিলাসবহুল চার্টার্ড ফ্লাইটে যাতায়াত করেন, ১৯৩০ সালের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন বিশ্বজুড়ে চলছিল তীব্র অর্থনৈতিক মহামন্দা। ফলে ইউরোপের অনেক দেশই এত দূরে গিয়ে খেলতে রাজি হয়নি।
ফিফা সভাপতির বিশেষ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ইউরোপের মাত্র চারটি দেশ (ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া) অংশ নিতে রাজি হয়। ‘এসএস কন্তে ভের্দে’ নামক এক বাষ্পীয় জাহাজে চড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ পর তারা উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে পৌঁছায়। সেই একই জাহাজে করে উরুগুয়েতে আনা হয়েছিল বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফিটি, যার নাম ছিল ‘জুলে রিমে ট্রফি’।
কোনো বাছাইপর্ব ছাড়াই ১৩ দলের লড়াই
ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিতে কোনো বাছাইপর্ব খেলতে হয়নি। ফিফার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মাত্র ১৩টি দেশ এই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। এর মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ৭টি, ইউরোপের ৪টি এবং উত্তর আমেরিকার ২টি দেশ ছিল।
১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই ফ্রান্স ও মেক্সিকোর মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বিশ্বকাপ ফুটবল। ম্যাচের ১৯ মিনিটে মেক্সিকোর জালে বল পাঠিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতার মর্যাদা লাভ করেন ফ্রান্সের লুজিয়েন লরেন্ট।
এক নজরে প্রথম বিশ্বকাপের ফ্ল্যাশব্যাক (১৯৩০):
আয়োজক দেশ: উরুগুয়ে
অংশগ্রহণকারী দল: ১৩টি
প্রথম ম্যাচ: ফ্রান্স বনাম মেক্সিকো (ফ্রান্স ৪-১ গোলে জয়ী)
প্রথম গোলদাতা: লুজিয়েন লরেন্ট (ফ্রান্স)
প্রথম হ্যাটট্রিক: বার্ট প্যাটেনোড (যুক্তরাষ্ট্র)
ফাইনালের বল বিতর্ক ও প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই মন্টেভিডিওর এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি এক অদ্ভুত বিতর্কের জন্ম দেয়। দুই দলই নিজেদের দেশের তৈরি বল দিয়ে খেলার জেদ ধরে। কোনো সমাধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফিফা সিদ্ধান্ত নেয়—প্রথমার্ধে খেলা হবে আর্জেন্টিনার বল দিয়ে এবং দ্বিতীয়ার্থে উরুগুয়ের বল দিয়ে!
মজার ব্যাপার হলো, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বলে খেলে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল দিয়ে খেলা শুরু হতেই পাশা উল্টে যায়। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে ৪–২ গোলে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে স্বাগতিক উরুগুয়ে।
নানা অভাব-অনটন, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা আর রোমাঞ্চের মধ্য দিয়ে যে টুর্নামেন্টের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা আজ ডালপালা মেলে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ১৯৩০ সালের সেই সাহসী পদক্ষেপেরই ফসল আজকের আধুনিক ফুটবল বিশ্বকাপ।