মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এক চরম উসকানিমূলক ও বিতর্কিত কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তিনি একটি ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে আমেরিকার জাতীয় পতাকা দিয়ে পুরো ইরানের মানচিত্র ঢেকে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ছবিটির ওপর তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—"ইউনাইটেড স্টেটস অব দ্য মিডল ইস্ট?" (মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?)।
আমেরিকা-ইসরায়েল যৌথ জোটের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধ নিরসনে যখন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোচনা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রাম্পের এমন পোস্ট পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই বার্তা মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অতীতের বিতর্কিত সামরিক হস্তক্ষেপের (বিশেষ করে ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ইরাক আক্রমণ) কালো অধ্যায়কে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এটি আমেরিকার আঞ্চলিক মিত্র এবং শত্রু—উভয় পক্ষকেই চরম ক্ষুব্ধ ও বিচলিত করতে পারে। এছাড়া, এই পোস্টটি ট্রাম্প প্রশাসনের আগের সেইসব প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে তারা বারবার বলেছিল যে তারা ইরানকে দীর্ঘ মেয়াদে দখল করে রাখতে চায় না।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর ওয়াশিংটন দাবি করেছিল, তারা সরাসরি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে চায় না, তবে সামরিক অভিযানের উপজাত বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এমন পরিবর্তন এলে তাকে তারা স্বাগত জানাবে।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক ভালি নাসর ট্রাম্পের এই আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের খামখেয়ালি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের ট্র্যাক রেকর্ড টেনে তিনি বলেন, এটি চলমান নাজুক শান্তি আলোচনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি মনে করিয়ে দেন, গত এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, চুক্তি না মানলে "একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে"। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় দুই পক্ষ যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়েছিল। এরপর থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া যুদ্ধ মূলত স্থগিত রয়েছে, তবে আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে এবং তেহরানও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রেখেছে।
অধ্যাপক ভালি নাসর এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "প্রথমে তিনি (ট্রাম্প) ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি ইরানের সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করতে চান, আর এখন তিনি ঘোষণা করছেন যে তিনি ইরানকে আমেরিকার সম্পত্তি বানাতে চান। এই ধরনের উদ্ভট আচরণ মূলত চলমান কূটনীতিকে ধ্বংস করে এবং নিজেদের দেশকে রক্ষায় সমস্ত ইরানিদের একতাবদ্ধ করে। অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার মাঝখানে তিনি আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দেহ তৈরি করে দিলেন।" তবে এই বিষয়ে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের এমন চরম উসকানিমূলক পোস্টের দিনই (শনিবার) অবশ্য মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের কথায় আভাস মিলেছে যে একটি নতুন চুক্তি খুব কাছাকাছি রয়েছে।
সিবিএস নিউজকে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, দুই পক্ষ "অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছে"। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, খুব শিগগিরই এই বিষয়ে একটি বড় আপডেট আসতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই পক্ষ বর্তমানে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করতে কাজ করছে এবং দুই দেশের "মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি এক বিন্দুতে মিলছে"।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের ভবিষ্যতের প্রভাবের মতো প্রধান প্রধান জটিল বিষয়গুলো নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
২০২০ সালের নির্বাচনের পর টুইটার (বর্তমান এক্স) থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর ট্রাম্প নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মটি চালু করেন, যা তিনি রাজনৈতিক শত্রু দমন, বড় ঘোষণা এবং এআই-জেনারেটেড ছবি পোস্টের কাজে ব্যবহার করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহির্বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির চেষ্টা দ্বারা সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। যার নজির হিসেবে রয়েছে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে সামরিকভাবে অপহরণ, কিউবার প্রতি অনবরত হুমকি এবং ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জোর চেষ্টা। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিনের আদলে ‘ডনরো ডকট্রিন’ (Donroe Doctrine) নামে অভিহিত করছে। এমনকি শনিবার ট্রাম্প আরও একটি ছবি পোস্ট করেন যেখানে গ্রিনল্যান্ডের একটি পর্বতশ্রেণীর ওপর থেকে তাঁর নিজের মুখ উঁকি দিচ্ছে এবং নিচে লেখা—"হ্যালো, গ্রিনল্যান্ড!" সূত্র: আল জাজিরা
ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’, বাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা: ট্রাম্প