আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে ‘একঘরে’ করতে গিয়ে বিপাকে ভারত

আপডেট : ৩০ মে ২০২৬, ০২:৪৫ এএম

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানকে ‘একঘরে’ বা বিচ্ছিন্ন করার যে কূটনৈতিক কৌশল ভারত নিয়েছিল, তা এখন উল্টো নয়াদিল্লির জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের এই কূটনৈতিক অবস্থান বর্তমানে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ফলে বিশ্বমঞ্চে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক ও সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামাবাদ।

মোদির সেই ঘোষণা এবং এক দশক পরের বাস্তব চিত্র

প্রতিবেদনে ২০১৬ সালের একটি জনসভার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তবে প্রায় এক দশক পর এসে ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন।

প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখন পরাশক্তি চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে শুধু নিজের অবস্থানই শক্ত করেনি, বরং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের বরফ গলাতে সক্ষম হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ও পাকিস্তানের নতুন সমীকরণ

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। 

কেবল রাজনৈতিক আলোচনা নয়, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে খনিজ সম্পদ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগ চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করার অনড় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে ইসলামাবাদ নিজেদের সক্রিয় কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

ভারতের কৌশল কি ব্যর্থ? যা বলছেন বিশ্লেষকরা

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রখ্যাত বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় কৌশল ‘অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ’ হয়েছে। 

তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক সংঘাত ও তথ্যযুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত নিজেদের পক্ষে টানতে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছে পাকিস্তান।

"ভারতের পাকিস্তানবিরোধী কৌশল মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি, উল্টো বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান নিজের অবস্থান আগের চেয়ে মজবুত করতে পেরেছে।"
— মাইকেল কুগেলম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এই মধ্যস্থতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের একক কূটনৈতিক আধিপত্যের অবস্থানকে কিছুটা দুর্বল করেছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।

বেইজিং-রিয়াদ অক্ষ ও অচল সার্ক (SAARC)

পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে চীনের সঙ্গে গভীর প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা (CPEC)। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গেও ইসলামাবাদের সম্পর্ক সম্প্রতি আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে, যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও কূটনীতিতে নতুন অক্সিজেন জুগিয়েছে।

এদিকে, ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে ‘সন্ত্রাসবাদ ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না’—এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে আসছে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। 

তবে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের এই অনড় অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ (SAARC) কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যা পুরো অঞ্চলের বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

দ্রুত বদলাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। পাকিস্তান একদিকে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করছে। 

অন্যদিকে, ভারত তার কঠোর ও একমুখী অবস্থানের কারণে কিছু ক্ষেত্রে নতুন নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখনও চরম অনিশ্চিত। দুই পারমাণবিক পরাশক্তির মধ্যে নতুন করে আনুষ্ঠানিক সংলাপ ও টেকসই কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু না হলে এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়।

HN
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত