কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সরবরাহ করা দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স পরিচালন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে কোটি টাকার এসব নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বীপবাসী আবারও জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কাঠের ট্রলার ও সাধারণ নৌযানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলায় মুমূর্ষু, প্রসূতি ও জটিল রোগীদের কক্সবাজারে নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে প্রতিকূল আবহাওয়া ও নৌযানের সংকট রোগী পরিবহনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) এবং কুতুবদিয়ারটি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা রিসার্চ ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (আরটিএমআই) প্রকল্পের আওতায় সরবরাহ করা হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স দুটি কেনার পর সেগুলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হস্তান্তর করা হয়।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় চালক, সহকারী, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখা সম্ভব হয়নি।
মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের মে মাসে সরবরাহ করা সি-অ্যাম্বুলেন্সটি মহেশখালী-কক্সবাজার আট কিলোমিটার নৌপথে রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। চালুর পর ২০২৩ সালে ৮৫ জন এবং ২০২৪ সালে ১৭৯ জন রোগী এই সেবা পান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ফাহিম শাহরিয়ার শাওন বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে পাঠাতে হয়। তাঁদের মধ্যে মুমূর্ষু ও জটিল প্রসূতি রোগীও থাকেন। অনেক সময় রাতেই অস্ত্রোপচারের রোগী স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়।
সরেজমিনে মহেশখালী জেটিঘাট এলাকায় দেখা যায়, সি-অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে খালে নোঙর করে রাখা হয়েছে। জোয়ারে পানিতে ভাসলেও ভাটায় কাদায় আটকে থাকে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নৌযানটি অযত্নে পড়ে রয়েছে।
মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুল ইসলাম জানান, অ্যাম্বুলেন্সটিতে ১৫০ লিটার অকটেন ও ৫ লিটার মবিল দিয়ে চারবার যাতায়াত করা যায়। প্রতিবার যাতায়াতে ব্যয় হয় প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। ৪০০ হর্সপাওয়ারের এ নৌযানে একসঙ্গে ৮ থেকে ১০ জন রোগী বহন করা সম্ভব হলেও ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর এটি আর চালু রাখা যায়নি।
তিনি বলেন, সি-অ্যাম্বুলেন্সটি ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ (আইএসও) প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। তবে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় এখনো অনুমোদন মেলেনি। চলতি মাসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মহেশখালীর বাসিন্দা মাহবুব রোকন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সি-অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় দ্বীপবাসী আবারও অনিরাপদ নৌযানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে রাতে জরুরি রোগীদের জন্য উপযুক্ত নৌযান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে কুতুবদিয়ার সি-অ্যাম্বুলেন্সটির অবস্থা আরও নাজুক। দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকার পর চলতি বছরের মে মাসে বড়ঘোপ ঘাটে জোয়ারের পানিতে সেটি তলিয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে নৌযানটি কার্যত কোনো সেবা দিতে পারেনি।
সরেজমিনে বড়ঘোপ জেটিঘাটে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহারের বাইরে থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ঘাটের টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম বলেন, প্রত্যাশিত সেবা তো দূরের কথা, এখন নৌযানটির দেখভালও কেউ করেন না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, কুতুবদিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের সাগরপথে কক্সবাজার বা চট্টগ্রামে যেতে হয়।
কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে একটি ঘূর্ণিঝড়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে তা সংস্কার করা হলেও বর্তমানে ব্যাটারির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তিনি জানান, একবার যাতায়াতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার জ্বালানি লাগে, যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। গত ডিসেম্বর বিশ্বব্যাংক, আইওএম ও ইউনিসেফকে বিষয়টি জানানো হলেও নতুন অর্থায়নের আশ্বাস মেলেনি।
সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল করতে নতুন প্রকল্প বা বিশেষ বরাদ্দের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের। তিনি বলেন, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আইএসও প্রকল্পের আওতায় পরিচালনার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি দ্রুত চালু করা জরুরি। অন্যথায় জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জীবনঝুঁকি আরও বাড়বে।
খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি ৩০ হাজার মানুষ
রাঙামাটিতে তলিয়ে গেছে ৩০ গ্রাম : পানিবন্দি ২০ হাজার মানুষ
হাতিয়ায় ভারী বর্ষণে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত
টঙ্গীতে সংঘর্ষে আহত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু
স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রাসেল বেনাপোলে আটক
মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ গেলো যুবকের