মৌলভীবাজারে টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর দুটি প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে জেলার অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ, তলিয়ে গেছে সড়ক, ভেঙে পড়েছে একটি কালভার্ট এবং পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আউশ ধান ও সবজির ক্ষেত।
স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বুধবার রাত প্রায় ১০টার দিকে কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে প্রায় ২০০ মিটার অংশে ভাঙন দেখা দেয়। এতে ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের মখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, কোনাগাঁও, বেরিগাঁও, শ্রীপুর, পাতারিগাঁও, কালায়েরবিল, আধকানী, ছনগাঁও, বন্দেরগাঁও, তেঁতইগাঁও ও ভানুবিল-ঘোরামারা গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন ধরে মখাবিল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কার করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে পাহাড়ি ঢলের চাপে বাঁধটি ভেঙে যায়।
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধেও ভাঙন দেখা দেয়। এতে উজিরপুর, কান্দিরপুল, একামধু, হরিপাশা, গণেশপুর, আকুয়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
বন্যার পানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় রোপণ করা আউশ ধান ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না নামলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার মনু ও ধলাই নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যার কারণে অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জের মাধবপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কের নুরজাহান চা বাগানসংলগ্ন গোয়ালবাড়ি এলাকায় একটি কালভার্ট ধসে পড়েছে। এছাড়া আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯১ মিলিমিটার, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৭৯ মিলিমিটার এবং বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আরও ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
টেংরা ইউনিয়নের সদস্য মো. সানুর মিয়া বলেন, স্থানীয়রা বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করলেও নদীর প্রবল স্রোতের কাছে তা টেকেনি। ফলে কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, বন্যার পানি এখনও না নামায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা সম্ভব হয়নি। পানি সরে গেলে মাঠপর্যায়ে জরিপ করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, ধলাই নদীর ভাঙনের কারণে সৃষ্ট বন্যাকবলিত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার বলেন, মনু নদীর ভাঙনের ফলে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, ধলাই নদীর মখাবিল ও মনু নদীর উজিরপুর এলাকায় বাঁধ ভেঙেছে। সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ধলাই নদীর একটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে আগে কাজ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে নদীর পানি ও বাঁধগুলোর পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি সংস্কার কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চলছে।
সংরক্ষণ সংকটে সাড়ে ৫শ বছরের ঘোড়াঘাটের সুরা মসজিদ
গুজব ছড়িয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনায় ১৮ জন গ্রেপ্তার
চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক ছাড়লেন আরও ৩১১ পর্যটক