সিরাজগঞ্জে অস্তিত্বহীন মিলে চাল বরাদ্দের অভিযোগ

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় অস্তিত্বহীন ও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চালকলের নামে বছরের পর বছর সরকারি চালের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অনিয়মের সুযোগে খাদ্য বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী চালকল মালিকরা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ।

সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বোরো সংগ্রহ কর্মসূচির আওতায় জেলার ৯টি উপজেলায় ২৬৫ কোটি টাকার চাল ক্রয়ের বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রায়গঞ্জ উপজেলায় ১৩৭টি মিলের অনুকূলে ১৮ হাজার ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে এসব মিলারের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৪৯ টাকা দরে প্রায় ১৮ হাজার ২০ মেট্রিক টন চাল কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য বিভাগ।

অস্তিত্বহীন মিলের নামে বরাদ্দের অভিযোগ

পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, রায়গঞ্জ উপজেলায় মোট প্রায় ২০৪টি রাইস মিল রয়েছে। এসব মিল থেকেই সরকারের আপদকালীন চাল সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাল সরবরাহের বরাদ্দকে কেন্দ্র করে চালকল মালিকদের পাশাপাশি খাদ্য বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা ও খাদ্যগুদামের পরিদর্শকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হন।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চান্দাইকোনা গ্রামের লুৎফা সেমি অটো ও ওমর সেমি অটো চালকল প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ায় মালিক মো. শহিদুল ইসলাম মিলটি বন্ধ করে দেন। দীর্ঘদিন কার্যক্রম না থাকায় সেখানে আগাছা জন্মেছে, বয়লারেরও অস্তিত্ব নেই এবং সাইনবোর্ড না থাকায় মিলটি শনাক্ত করাও কঠিন। তবে একই চাতালে বাবা-ছেলে মিলে চারটি লাইসেন্স দেখিয়ে বছরের পর বছর চালের বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি মৌসুমেও এসব লাইসেন্সের বিপরীতে ১৪৭ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

অভিযোগ অনুযায়ী, আনোয়ারা চালকল, সারা চালকল, কহিনুর সেমি অটো চালকল, সমন্বয় চালকল, পিতা-পুত্র সেমি অটো চালকল, মামা-ভাগ্নে সেমি অটো চালকল, সোহাগ-৩ সেমি অটো চালকল, সোনালী সেমি অটো চালকল, প্রতীক সেমি অটো চালকল, খাজা সেমি অটো চালকল, হাজী কাউসার সেমি অটো চালকল, নুসরাত চালকল, সরকার চালকল, রাফি চালকল, লুৎফা সেমি অটো ও ওমর সেমি অটো চালকল একটি চাতাল দেখিয়ে তিন থেকে চারটি লাইসেন্সের মাধ্যমে বরাদ্দ নিয়েছে। ১৩৭টি চালকলের মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫টির অধিকাংশেরই কার্যক্রম নেই। ধানের চাতাল থাকলেও বছরের পর বছর বয়লারে আগুন জ্বলে না। এছাড়া, এসব মিলের ২০১৩ সালের পর থেকে পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মিল মালিকের বক্তব্য

চান্দাইকোনা গ্রামের সৌরভ-২ সেমি অটো চালকলের মালিক স্বদেশ চন্দ্র ভৌমিক জানান, তার এবং তার ভাইয়ের চালকল প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। তারা সমিতির মাধ্যমে প্রতিবছরই বরাদ্দ পান। এবার তিনি ৬২ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ পেয়েছেন। চালকল বন্ধ থাকায় তিনি এবং অন্যান্য চালকল মালিক অন্য মিল থেকে চাল কিনে চান্দাইকোনা সরকারি খাদ্যগুদামে সরবরাহ করেন।

বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ রয়েছে, কোনো মিলের নামে চালের বরাদ্দ দেওয়ার আগে সেটি বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য কি না, সে বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বন্ধ ও অস্তিত্বহীন মিলের নামেও বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট মিলারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, সরকার কোনো মিলের সঙ্গে চুক্তির আগে চাল সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করে থাকে। সঠিকভাবে তদন্ত হলে এ ধরনের অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। তাই সংশ্লিষ্ট মিল মালিক ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

রায়গঞ্জ উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সবুজ জানান, চালের বরাদ্দের সঙ্গে তাদের সংগঠনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অস্তিত্বহীন মিলের নামে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রায়গঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. সেরাজুল ইসলাম সরকার জানান, উপজেলায় চাল বরাদ্দের তালিকা তৈরির জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, খাদ্যগুদামের পরিদর্শকসহ একটি কমিটি রয়েছে। তারা তালিকা জেলা কার্যালয়ে পাঠান এবং জেলা কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে বরাদ্দ দেয়। এ বিষয়ে তার ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার নেই।

চান্দাইকোনা খাদ্যগুদামের পরিদর্শক (ওসি এলএসডি) তন্ময় বিশ্বাস জানান, এবার তিনি যাচাই-বাছাই কমিটিতে ছিলেন না এবং বিষয়টি সম্পর্কে তার জানা নেই। খাদ্যগুদামে নিম্নমানের চাল গ্রহণের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, অস্তিত্বহীন কোনো মিলের নাম বরাদ্দ তালিকায় নেই। যেসব মিল বন্ধ রয়েছে, সেসব মিলের সঙ্গে চুক্তি করা হয়নি। তবে এর বাইরে কোনো মিলের অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

YA
আরও পড়ুন