বাংলাদেশে তীব্র তাপদাহ ও অস্বাভাবিক গরমের কারণে ২০২৪ সালে সরাসরি ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি (১.৩–১.৮ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।
বিশ্বব্যাংক ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলোর এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশিত ‘A Livable Future: Protecting Jobs and Growth from Extreme Heat in South Asia's Cities’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (FCDO), সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এবং গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (GFDRR)।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রধান শহরে তাপদাহের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপদাহের কারণে কর্মঘণ্টা হারানোর দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বর্তমানে অতিরিক্ত গরমের কারণে রাজধানীতে বছরে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান।
২০৫০ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ হতে পারে। আর ২০৮০ সালে কর্মঘণ্টা অপচয়ের হার ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাবে, যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমতুল্য।
একই সময়ে কলকাতায় এই ক্ষতি হবে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে ৬ লাখ ২৯ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে ঢাকার ক্ষতি দুই শহরের তুলনায় আরও বেশি হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পও তাপদাহের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের তৈরি পোশাক খাত সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড-এর আওতায় ২০১৬ সাল থেকে পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ২৭০টিরও বেশি কারখানা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত LEED সনদ অর্জন করেছে, যা ভবিষ্যতে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তীব্র গরম দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের তাপপ্রবাহ চলাকালে দেশে দৈনিক সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে গড় উৎপাদন ছিল মাত্র ১৩ হাজার ৯৮৮ মেগাওয়াট।
ফলে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়। জ্বালানি সংকটের কারণে এ সময় দেশজুড়ে লোডশেডিং করতে হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।
এছাড়া ২০২৪ সালের তীব্র গরমে দেশের বিভিন্ন জাতীয় মহাসড়কে বিটুমিন গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে সড়ক মেরামতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, তাপদাহ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগেও উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে ভারতের আহমেদাবাদের হিট অ্যাকশন প্ল্যান-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা অর্জিত হয়েছে।
বাংলাদেশও এ ধরনের উদ্যোগের দিকে এগোচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি প্রথমবারের মতো পূর্বাভাসভিত্তিক তাপপ্রবাহ সহায়তা কর্মসূচি চালু করে। এই কর্মসূচির আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪ হাজার পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
এদিকে, অস্বাভাবিক গরমের কারণে দেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার এসি বিক্রি হয়েছে, যা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় তিন গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসি ব্যবহারের কারণে পারিবারিক ব্যয় বাড়লেও এটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে কিছুটা সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তাপদাহের প্রভাব আরও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নগর উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মিং ঝাং বলেন, সংস্থাটির বর্তমান উন্নয়ন কৌশলে তাপদাহ সহনশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষয়ক্ষতি কমাতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আগাম প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থায় এখনই বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতায় যে পরিবর্তন আনলো যুক্তরাষ্ট্র
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও বিনিয়োগ আকর্ষণে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ
মানবপাচার রোধে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার সরকারের
আস্থার বীজ বুনতে পারলেই বদলাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক