আজ ৬ আগস্ট, হিরোশিমা দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাপানের হিরোশিমা শহরে বিশ্বের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই হামলায় মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষ নিহত হন। বছরের শেষ নাগাদ বিস্ফোরণ, অগ্নিদাহ ও তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে। ৮১ বছর পরও দিনটি বিশ্বজুড়ে শুধু শোকের নয়, পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের দাবিও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে হিরোশিমার ওপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। তখন শহরে দিনের স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিস্ফোরণের তীব্র আলো ও তাপে পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আকাশে সৃষ্টি হয় বিশাল মাশরুম আকৃতির ধোঁয়ার মেঘ, আর লাখো মানুষের জীবন চিরতরে বদলে যায়।
এই বিভীষিকার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন ছিলেন তামেতো উয়েমোরি। শহরের উপকণ্ঠের একটি নিরাপত্তা ইউনিটের সদস্য হিসেবে হামলার পরদিন তিনি উদ্ধারকাজে অংশ নেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে গিয়ে তিনি পোড়া মরদেহ, আহত মানুষের পানির জন্য আর্তনাদ এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া জনপদের ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তার ছোট ভাইসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য ওই হামলায় নিহত হয়েছেন।
১৯৮৭ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উয়েমোরি সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তিনি ছাতা ব্যবহার করছিলেন এবং নিহতদের দেহে ভিড় করা মাছিগুলোও রোদ থেকে বাঁচতে সেই ছাতার নিচে আশ্রয় নিচ্ছিল। সেই বিভীষিকার স্মৃতি তাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত শোককে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের শক্তিতে রূপ দেন। তিনি ছিলেন সেই সব হিবাকুশা বা পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের একজন, যারা সারা জীবন বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। উয়েমোরির ভাষায়, “এখনই এটি বন্ধ করতে হবে। পৃথিবীর সব মানুষ যেন ভাই-বোনের মতো একসঙ্গে কাজ করে এই বিপদ থামায়। আমাদের হিরোশিমার শিক্ষা থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে হবে।”
যুদ্ধের অপর প্রান্ত থেকেও একই উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্য স্যান্ডফোর্ড জেড. পারসন্স। বোমা হামলার কয়েক মাস পর হিরোশিমায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি ধ্বংসযজ্ঞ দেখে গভীরভাবে মর্মাহত হন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক জীবন ছেড়ে তিনি শান্তি ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে আন্তর্জাতিক আন্দোলনে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই কাজ চালিয়ে যান।
উয়েমোরি ও পারসন্স—দুই ভিন্ন দেশের, দুই ভিন্ন পক্ষের মানুষ হলেও তাদের অভিন্ন বিশ্বাস ছিল একটাই—মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
হিরোশিমার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্র নাগাসাকিতেও দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। দুই শহরে বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও তেজস্ক্রিয়তার কারণে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও বিতর্ক রয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ করতে এই হামলা অপরিহার্য ছিল কি না। তবে এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত যে, এই দুই হামলা মানবসভ্যতাকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংসক্ষমতা সম্পর্কে স্থায়ী শিক্ষা দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ১৯৪৫ সালের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাতে ১২ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর অনেকগুলোর ধ্বংসক্ষমতা হিরোশিমায় ব্যবহৃত বোমার তুলনায় বহুগুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরস্ত্রীকরণের গতি কমে গেছে। একই সময়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিও বেড়েছে। ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্ঘটনা, সাইবার হামলা কিংবা প্রচলিত যুদ্ধের বিস্তার থেকেও পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
শান্তিকর্মীদের মতে, হিরোশিমা দিবস কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি হওয়া উচিত পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রতি বৈশ্বিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার উপলক্ষ। ধাপে ধাপে অস্ত্র কমানো, নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি, স্বচ্ছ যাচাই ব্যবস্থা এবং বড় শক্তিগুলোর আন্তরিক সংলাপই একটি নিরাপদ বিশ্বের পথ তৈরি করতে পারে।
আজ হিরোশিমা দিবসে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের দাবি আবারও জোরালো হচ্ছে। কারণ হিরোশিমার বেঁচে থাকা মানুষগুলো তাদের অভিজ্ঞতা ও সতর্কবার্তা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। এখন সেই শিক্ষা থেকে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার দায়িত্ব বর্তেছে বর্তমান প্রজন্মের ওপর।
সূত্র: জাপান টাইমস
হরমুজ প্রণালি চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে: ইরান
পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হচ্ছে আল জাজিরা? সিপিজে-র উদ্বেগ
পাকিস্তানে ১৮ লাখ রুপিতে বিক্রি বিরল প্রজাতির এক ছাগল!
ইহুদিবিদ্বেষ বরদাশত নয় : কড়া সতর্কবার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের