আজ খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০১ এএম

আজ ১৫ আগস্ট। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী। ফেনীর ফুলগাজীর ইস্কান্দার মজুমদার ও দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী চন্দনবাড়ির তৈয়বা মজুমদার দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় বাবা-মায়ের আদরের সেই ‘পুতুল’ই পরিণত হন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রীতে। 

গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে নিজ রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে খালেদা জিয়া বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কাছে হয়ে ওঠেন আস্থার প্রতীক। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তিনি ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ খেতাবেও ভূষিত হন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তবে তাঁর ‘দেশনেত্রী’ হয়ে ওঠার পথ কখনোই সহজ ছিল না। রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে নানা ষড়যন্ত্র, নির্যাতন, প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

আজ থেকে ৮২ বছর আগে, ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি। জলপাইগুড়ির নয়াবস্তির ছোট্ট শহরে তাঁর জন্মে পরিবারে নেমে আসে আনন্দের আবহ।

জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় ‘শান্তি’। পরে মেজ বোন সেলিনা ইসলাম আদর করে তাঁর নাম দেন ‘পুতুল’। জীবনের প্রথম দুই বছর জলপাইগুড়িতেই কাটে তাঁর।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে চলে আসেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে দিনাজপুরে।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান তাঁর বাবা। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন তিনি। পরে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ভর্তি হন দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। ১৯৬৩ সালে সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কলেজে পড়ার সময় ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় পিত্রালয়ে তৎকালীন সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে হয়। ১৯৬৫ সালে কলেজে ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়নকালে স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ ও বন্দিজীবন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের মানুষের ওপর নৃশংস হামলা শুরু করলে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

এ সময় খালেদা জিয়া চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর দুই সন্তানকে নিয়ে ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় আসেন। পরে বড় বোন খুরশীদ জাহান হকের বাসায় ২৭ জুন পর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলেন। ২ জুলাই পাকিস্তানি সেনারা দুই সন্তানসহ তাঁকে আটক করে। দীর্ঘদিন গৃহবন্দি থাকার পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতির শীর্ষে

১৯৮১ সালের ৩১ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ছিলেন মূলত একজন সাধারণ গৃহবধূ। স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের দাবিতে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। পরের বছর মার্চে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের সমর্থনে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে বহুবার গ্রেপ্তার ও বন্দিদশা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে বিএনপি ও তাঁর সমর্থকদের দাবি।

জীবন্ত ইতিহাস হয়ে থাকা এক রাজনৈতিক চরিত্র

বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি নন—নিজ কর্ম ও রাজনৈতিক ভূমিকার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক, আবার রাজনৈতিক বিরোধীদের কাছে তাঁর ভূমিকা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন মূল্যায়ন। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘ প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন—‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মানুষ বিদায় জানায় দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক নেত্রীকে।

তাঁর জীবন ছিল রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম, ক্ষমতা ও প্রতিকূলতার দীর্ঘ পথচলা। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার এই যাত্রা বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিএনপির কর্মসূচি

খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ১৫ আগস্ট সারাদেশে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে বিএনপি।

গতকাল শুক্রবার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় অথবা মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের যথাযোগ্য মর্যাদায় কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।

Maz
আরও পড়ুন