যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার পর ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে কোন কোন জাহাজ চলাচল করতে পারবে, তা আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রণালিতে নিষিদ্ধ জাহাজের ইরানি ‘ব্ল্যাকলিস্টে’ নতুন করে আরও ১১টি জাহাজ যুক্ত হয়েছে। এতে তালিকাভুক্ত জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে।
তেহরানের এমন পদক্ষেপে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান বলছে, তালিকাভুক্ত জাহাজগুলো প্রণালিতে চলাচলের ক্ষেত্রে তাদের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। এসব জাহাজকে জরিমানা, আটক কিংবা পণ্য জব্দের মতো শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের (PGSA) তালিকায় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারের পাশাপাশি এলএনজি ও এলপিজি পরিবহনকারী এবং অন্যান্য জ্বালানি বহনকারী জাহাজও রয়েছে। এর আগে ২৪ আগস্ট ইরান ৪৫টি ট্যাংকারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। পরে নতুন করে আরও ১১টি জাহাজ যোগ করা হয়।
ইরানের অবস্থান হলো, তালিকাভুক্ত জাহাজগুলোর সঙ্গে সরাসরি বা জাহাজ-থেকে-জাহাজ পণ্য স্থানান্তরের মতো কোনো সহযোগিতায় যুক্ত অন্য জাহাজও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে শুধু নির্দিষ্ট জাহাজ নয়, পুরো শিপিং নেটওয়ার্কের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।
তেহরানে আল জাজিরার প্রতিবেদক সিনেম কোসেওগ্লুর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরানের বক্তব্যে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ফিরবে না। অন্যদিকে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, সর্বশেষ মার্কিন হামলা তেহরান সহজভাবে মেনে নেবে না এবং এর জবাব দেওয়া হবে ‘অসমমিত ও বহুস্তরীয়’ কৌশলে।
এর ফলে হরমুজ প্রণালি এখন সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক দর-কষাকষি—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ইরানের কৌশলের আরেকটি দিক হলো, সব জাহাজের জন্য একই ধরনের বিধিনিষেধ প্রয়োগ না করে বেছে বেছে চলাচলের সুযোগ দেওয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলবাহী ট্যাংকারের তুলনায় তুলনামূলক কম বাধার মুখে প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে। অর্থাৎ কোন জাহাজকে যেতে দেওয়া হবে আর কোনটিকে বাধা দেওয়া হবে—সে সিদ্ধান্তে ইরান আরও নির্বাচিত পদ্ধতি অনুসরণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্যেও হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার চিত্র স্পষ্ট। রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রণালিটি দিয়ে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ—দুটি মাঝারি আকারের ট্যাংকার, একটি কামসারম্যাক্স কার্গো জাহাজ ও একটি হ্যান্ডিসাইজ জাহাজ—পার হয়েছে। আগের ১০ দিনের গড় ছিল দিনে ১৫টি জাহাজ। তবে যেসব জাহাজের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ ছিল, সেগুলো এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ যায়। ফলে জাহাজ চলাচল কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
এরই মধ্যে হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব তেলের বাজারেও পড়ছে। রয়টার্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সপ্তাহে প্রায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মার্কিন ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই বাজারে মূল চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সামরিক উদ্যোগ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনী প্রায় ৪০টি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করেছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ইরানের কালো তালিকা যত বাড়ছে এবং জাহাজ চলাচল যত কমছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করা আগামী দিনের কূটনৈতিক ও সামরিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে থাকবে।
তাইজে হুথিদের হামলা, আবারও ঘর ছাড়ছেন শত শত পরিবার
মানুষের মূত্রেও গলছে এভারেস্টের বরফ!
'ডিসেম্বরে নেত্রী আইতাছে', বলেই জামায়াত নেতার ওপর হামলা