সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ

দুদককে ব্যবহার করে বিরোধীদের হয়রানি করা হচ্ছে

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তাঁর প্রশ্ন, ‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসে থাকা অবস্থায় পদোন্নতি করি, টাকা নিই; এটা কীভাবে সম্ভব?’

‘অভিযোগ বনাম বাস্তবতা: এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে দুদকে দায়েরকৃত অভিযোগের প্রকৃত তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, অভিযোগের তথ্যসহ ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে এর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। বরং বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংঘটিত একটি পদোন্নতির ঘটনায় তাকে জড়ানো হয়েছে। 

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা থাকাকালে মন্ত্রণালয়ের পদায়ন-বদলিসংক্রান্ত ব্যাপারে দুদকের সাম্প্রতিক যেসব অভিযোগ এবং সংস্থাটির মুখপাত্রের যে বক্তব্য, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার। সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদের পক্ষ থেকে একটি ‘প্রেজেন্টেশন’ দেওয়া হয়। এতে অভিযোগগুলোর প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা, দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্যের বাস্তবতা প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরা হয়।

আসিফ মাহমুদ বলেন, একটি অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে অর্থ নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ১১২ জনের চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতেই এই দায়িত্ব বাতিল করা হয়। আসিফ মাহমুদ বলেন, ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর ১১২ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে এ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া হয়। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর তাদের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে মন্ত্রণালয়। ফলে সিদ্ধান্তটি ছিল আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ। এটি তার ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। 

অন্য অভিযোগে ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পছন্দের স্থানে পদায়নের বিনিময়ে প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়ার প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। অভিযোগটি করা হয় ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল। তবে পদোন্নতির আদেশ হয় ১১ মে। তিনি ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। ফলে এই পদোন্নতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার সুযোগ ছিল না। আসিফ মাহমুদের প্রশ্ন, ওই পদোন্নতিতে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তখনকার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান না করে তার বিরুদ্ধে কেন অনুসন্ধান করা হচ্ছে?

আসিফ মাহমুদ বলেন, দুদক অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করলে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর আগে অভিযোগের সময়কাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্বে থাকার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারত। সব কটি অভিযোগই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। এই অনুসন্ধান রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদক কমিশন-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুনভাবে কমিশন গঠন করা হয়েছে। সেই দুদক রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাকে রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানো ও হয়রানি করার লক্ষ্যেই অনুসন্ধানটি শুরু করা হয়েছে।

আসিফ মাহমুদের অভিযোগের একটি অংশ দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্য ঘিরে। তার ভাষ্য, দুদকের মুখপাত্র প্রথমে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ায় অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পরে সাংবাদিকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ওই বক্তব্য ভুলবশত বলা হয়েছে জানিয়ে তা ব্যবহার না করার অনুরোধ করা হয়। দুদকের মুখপাত্রের প্রথম বক্তব্যের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার খবর প্রচারিত হয়। কিন্তু পরে ওই বক্তব্য প্রকাশ্যে প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হয়নি। এতে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ হিসেবে দেখছেন বলে উল্লেখ করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, অভিযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, সিদ্ধান্তের তারিখ ও দায়িত্বে থাকার সময়কাল বিবেচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্যের বিষয়ে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হন আসিফ মাহমুদ। তিনি শুরুতে ছিলেন শ্রম মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পর থেকে তিনি স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেন। তখন থেকে তিনি এনসিপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত