তুলার মতো ভেসেছিলো দুই-তিনতলা বাড়ির সমান পাথর!

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

পাথর মানেই ভারী। মাটির সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকা বিশাল পাথরকে সামান্য নড়াতেও যেখানে প্রয়োজন হয় ভারী যন্ত্রপাতি, সেখানে সেই পাথরই যদি বন্যার পানিতে তুলার মতো ভেসে যায়—দৃশ্যটি কেমন হতে পারে?

নেপালের নুয়াকোটের বেত্রাবতি বাজারে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পর এমনই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের বর্ণনা সামনে এসেছে। স্থানীয়ভাবে ধারণ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, নদী ও পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে বিশাল বিশাল পাথরখণ্ড স্থানচ্যুত হয়ে পানির সঙ্গে ভেসে বা গড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো পাথরের আকার এতটাই বড় যে তা দুই থেকে তিনতলা বাড়ির সমান বলে মনে হয়েছে।

যে পাথর সাধারণ সময়ে পাহাড় বা নদীর তলদেশে স্থির পড়ে থাকে, ভয়াবহ পানির স্রোতে সেটিই যেন হয়ে উঠেছিল ভাসমান এক দৈত্য।

পাথরের আকারই বলে দিচ্ছে স্রোতের শক্তি

বেত্রাবতি বাজারের দৃশ্য দেখে সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে পাথরগুলোর আকার। একটি বিশাল পাথরখণ্ডের পাশে দাঁড়ালে মানুষকে প্রায় ক্ষুদ্র মনে হয়। স্থানীয়দের ভাষায়, এত বড় পাথর যখন পানির স্রোতে নড়াচড়া করতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু বন্যা থাকে না—পরিণত হয় ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞে।

বন্যার পানিতে পাথরও কেন নড়ে?

সমতলের সাধারণ বন্যার সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের চরিত্র এক নয়। পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এলে স্রোতের গতি অনেক বেড়ে যেতে পারে। নদীর তলদেশ ও আশপাশের পাথর, বোল্ডার কিংবা শিলাখণ্ড তখন পানির প্রবল চাপের মুখে নড়তে শুরু করে।

বিশাল কোনো পাথর পুরোপুরি পানির ওপর ভাসছে—বৈজ্ঞানিক অর্থে এমনটা সবসময় নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবল স্রোত পাথরকে ঠেলে, গড়িয়ে কিংবা টেনে নিয়ে যায়। দূর থেকে বা ভিডিওতে সেই দৃশ্যকে পাথর ‘ভেসে যাওয়ার’ মতো মনে হতে পারে।

কিন্তু যে পাথরকে স্বাভাবিক সময়ে মানুষের পক্ষে সরানো প্রায় অসম্ভব, সেটি যদি কয়েক মিটার দূরেও স্রোতের সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করে, তাতেই বোঝা যায় পানির শক্তি কতটা ভয়াবহ ছিল।

পাহাড়ি বন্যার আরেক নাম ‘পাথরের স্রোত’

পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় শুধু পানি নয়, পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষও নেমে আসে। একে অনেক সময় ডেব্রিস ফ্লো বলা হয়। এতে কাদা, বালি, গাছের গুঁড়ি, ছোট-বড় পাথর এবং পাহাড়ের ভাঙা অংশ একসঙ্গে স্রোতের সঙ্গে নিচে নেমে আসে।

এই ধরনের স্রোত সাধারণ বন্যার পানির তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। কারণ এখানে পানির সঙ্গে যুক্ত থাকে কঠিন ও ভারী বস্তু। একটি বড় পাথর স্রোতের সঙ্গে চলতে চলতে অন্য পাথর বা স্থাপনায় আঘাত করলে সেই শক্তি আরও বাড়তে পারে।

নুয়াকোটের বেত্রাবতি বাজারের বিশাল পাথরগুলোর দৃশ্য তাই শুধু বিস্ময়ের নয়, পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও।

প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়

দুই-তিনতলা বাড়ির সমান পাথরকে মানুষের চোখের সামনে স্রোতের সঙ্গে নড়তে দেখা নিঃসন্দেহে আতঙ্কের অভিজ্ঞতা। যে পাথর বছরের পর বছর একই জায়গায় পড়ে ছিল, মুহূর্তের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেটিই হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর ঝুঁকি।

বেত্রাবতি বাজারের এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির শক্তিকে কখনোই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। পাহাড়, নদী ও মানুষের বসতি—এই তিনের সম্পর্ক যতটা সুন্দর, দুর্যোগের সময় ততটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

একটি পাথরখণ্ডের ছবিই যেন সেই গল্প বলছে। আকারে দুই-তিনতলা বাড়ির মতো বিশাল, অথচ ভয়াবহ স্রোতের সামনে তারও কোনো স্থিরতা নেই। মানুষের চোখে যা ‘অসম্ভব’ মনে হয়, প্রকৃতির শক্তির কাছে সেটিই কখনো কখনো হয়ে ওঠে বাস্তব দৃশ্য।

বেত্রাবতি বাজারের সেই পাথরগুলো তাই শুধু পাথর নয়—পাহাড়ি বন্যার ভয়াবহ শক্তির এক নীরব সাক্ষী। আর সেই দৃশ্য দেখে মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা একটি বাক্যই হয়তো পুরো ঘটনাটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করে—“সেদিন এই পাথরগুলোও তুলার মতো উড়তেছিল!”

ওয়াইএ
আরও পড়ুন