ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায় দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের চিকাজানী মোড়। ব্যস্ত সড়কের কোলাহল পেরিয়ে একটু এগোলেই চোখে পড়ে ছোট্ট একটি মসজিদ। আয়তনে ছোট, গড়নে সাদামাটা। তবে দেয়ালে লেগে আছে বহু পুরোনো স্থাপত্যের ছাপ। গম্বুজজুড়ে সময়ের রেখা। দুই পাশে দুটি জানালা, সামনে ছোট্ট একটি দরজা। নাম চিকাজানী গায়েবি মসজিদ।
মসজিদটি ঘিরে লিখিত ইতিহাসের চেয়ে মানুষের মুখে মুখে চলে আসা গল্পই বেশি। কারও কাছে এটি শত শত বছরের পুরোনো একটি ধর্মীয় স্থাপনা, কারও কাছে অলৌকিকভাবে আবিষ্কৃত মসজিদ। আবার কারও বিশ্বাস, এই স্থান থেকেই একসময় দেওয়ানগঞ্জ অঞ্চলে ইসলামের প্রচার শুরু হয়েছিল।
সব মিলিয়ে গায়েবি মসজিদ যেন ইতিহাস, বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও লোককথার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।
মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কাগজে-কলমে এটি প্রাচীন মসজিদ হিসেবে পরিচিত হলেও ঠিক কত বছর আগে এটি নির্মিত হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য কোনো নথি স্থানীয়দের কাছে নেই।
তবে স্থানীয়দের ধারণা, মসজিদটির বয়স সাত থেকে আটশ বছর হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্বাস আলী জানান, তিনি তাঁর দাদা ও আগের প্রজন্মের মানুষের কাছ থেকেও মসজিদটির ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউই এর নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।
আব্বাস আলীর ভাষ্য, মুরুব্বিদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, একসময় মসজিদটির চারপাশ ওলু মাটি ও ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। পরে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ মাটির নিচে একটি মসজিদের অস্তিত্বের সন্ধান মেলে। সেই থেকেই এর নাম হয়ে যায় ‘গায়েবি মসজিদ’।
গল্পটির সত্যতা যাচাই করার মতো লিখিত দলিল স্থানীয়দের হাতে নেই। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গল্পটি টিকে আছে মানুষের স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতিই আজ মসজিদটির পরিচয়ের অন্যতম অংশ।
এক শতাংশেরও কম জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো মসজিদটির স্থাপত্যে নেই আধুনিকতার চাকচিক্য। বরং সরল গড়নেই যেন তার সৌন্দর্য। পুরোনো অংশটি অক্ষত রেখেই সামনে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন তিনতলা ভবন। ফলে আধুনিক স্থাপত্যের পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরোনো সেই ছোট্ট মসজিদ।
একসময় ইমামসহ মাত্র ২১ জন মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতেন বলে স্থানীয়রা জানান। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে মানুষের সংখ্যা, বেড়েছে নামাজের কাতার। ছোট্ট মসজিদটিরও তাই প্রয়োজন হয়েছে নতুন পরিসরের। তবে নতুন ভবন নির্মাণ হলেও পুরোনো মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়নি। যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে সেটিকে।
স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; বরং তাঁদের বিশ্বাস ও আবেগের অংশ। গায়েবি মসজিদকে ঘিরে ছড়িয়ে থাকা গল্পের তালিকায় রয়েছে আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনি।
স্থানীয়দের জনশ্রুতি, একসময় মসজিদের আশপাশে দুটি দাড়িওয়ালা সাপ দেখা যেত। সাপ দুটি কাউকে কোনো ক্ষতি করত না। বরং বছরের পর বছর তারা মসজিদের আশপাশেই থাকত বলে দাবি স্থানীয়দের। একসময় একটি সাপকে মেরে ফেলা হয়। এরপর থেকে অন্য সাপটিকেও আর দেখা যায়নি।
এই গল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবু স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে সাপ দুটির গল্প আজও বেঁচে আছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আগের প্রজন্মের কাছ থেকে গল্পটি শুনে আসছেন তাঁরা।
দেওয়ানগঞ্জের মানুষের কাছে গায়েবি মসজিদের রহস্যময়তার সঙ্গে তাই এই গল্পটিও যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।
মসজিদটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বিশ্বাস। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন, ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সাহাবিরা এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং এই স্থান থেকেই দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়েছিল। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক দলিল বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়নি।
তবুও বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথাটি মানুষের মুখে মুখে টিকে আছে। আর সেই বিশ্বাসই গায়েবি মসজিদের প্রতি স্থানীয় মানুষের আলাদা এক আবেগ তৈরি করেছে।
দিনের আলো ফুরিয়ে এলে মসজিদের চারপাশে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ভরে ওঠে মসজিদ প্রাঙ্গণ। শিশুদের কোরআন তেলাওয়াতে মুখর হয়ে থাকে চারদিক। পুরোনো দেয়ালের পাশে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে কোরআনের আয়াত যেন ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের এক সেতুবন্ধন তৈরি করে।
মসজিদের সব কার্যক্রম চলে মুসল্লিদের দানে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি মাসে মসজিদের দান বাক্সে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। সেই অর্থ দিয়েই মসজিদের বিভিন্ন খরচ ও পরিচালনার ব্যয় মেটানো হয়।
দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই মসজিদ দেখতে আসেন। কেউ আসেন পুরোনো স্থাপত্য দেখতে, কেউ আসেন এর গল্প শুনে। আবার কেউ মনের আশা পূরণের আশায় এখানে মানত করেন, দোয়া করেন।
গায়েবি মসজিদের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইমামুল হকের জীবনও। একসময় তিনি ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরে ইসলাম গ্রহণ করে এখন এই মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর কথায়, ২০১৭ সালে কয়েকদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় ছিলেন তিনি। এক রাতে স্বপ্ন দেখার পর সকালে মসজিদে এসে শরীর অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েন। সে সময় এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে মসজিদের ইমামের কাছে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি।
ইমামুল হক বলেন, তাঁর পুরো পরিবারও তখন ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। বর্তমানে এই মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর জীবন যেন এই মসজিদকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। দিনের বড় একটি সময় কাটে এখানেই।
মসজিদের দীর্ঘদিনের মুয়াজ্জিন হাফেজ নুরুল ইসলামও এই মসজিদকে ঘিরে প্রচলিত নানা গল্পের কথা জানালেন। তাঁর বাড়িও এই এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই মসজিদটি সম্পর্কে নানা কথা শুনে আসছেন তিনি। নুরুল ইসলামের ভাষায়, তাঁদের দাদা-নানারা এই মসজিদ নিয়ে যেসব গল্প বলতেন, তাঁরাও সেসব শুনেছেন আগের প্রজন্মের কাছ থেকে।
অর্থাৎ, মসজিদের গল্পগুলো শুধু একজনের মুখে তৈরি হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে সেগুলো টিকে আছে।
পুরোনো মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের সতর্কতা। নুরুল ইসলাম জানান, মূল মসজিদে চুন-সুরকি ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিবছর রং করা হয়। এখন পর্যন্ত মসজিদের কোনো অংশ দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।
চিকাজানী গায়েবি মসজিদের সামনে দাঁড়ালে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো এটাই কতটা ইতিহাস, আর কতটা লোককথা?
সাত-আটশ বছরের পুরোনো হওয়ার দাবি, জঙ্গলের ভেতর হঠাৎ মসজিদ আবিষ্কারের গল্প, দাড়িওয়ালা দুই সাপ কিংবা সাহাবিদের আগমনের বিশ্বাস সবকিছুরই নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রয়োজন।
কিন্তু ইতিহাসের নথি না থাকলেও লোকস্মৃতির নিজস্ব একটি শক্তি আছে। সেই শক্তিতেই কোনো কোনো গল্প শত বছর টিকে থাকে। প্রজন্ম বদলায়, মানুষ বদলায়, চারপাশ বদলে যায়। কিন্তু গল্প থেকে যায়।
চিকাজানী গায়েবি মসজিদও হয়তো তেমনই এক গল্পের বাহক। তার পুরোনো দেয়াল, ছোট্ট দরজা আর গম্বুজের নিচে আজও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়। শিশুরা কোরআন পড়ে। দূর-দূরান্তের মানুষ আসে কেউ ইতিহাস খুঁজতে, কেউ রহস্যের টানে, কেউ বিশ্বাস নিয়ে।
আর মসজিদটি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। সময় পেরিয়ে যায়, গল্প বদলায়। কিন্তু গায়েবি মসজিদের গল্প শেষ হয় না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষের প্রশ্নপত্র বাতিল
লোহিত সাগরের নৌপথ নিয়ন্ত্রণে হুথিদের ব্যবহার করছে ইরান: ইয়েমেনি রাষ্ট্রদূত
অনার্স দ্বিতীয়বর্ষের ফরম পূরণের সময় বাড়ালো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
পুলিশের ছয় কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন
যে কারণে 'হারেৎজ' পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করবেন নেতানিয়াহু
ব্রিকস সম্মেলনের আগেই ভারতে রাশিয়ার ৩ সামরিক বিমান
মরক্কো থেকে অভিবাসী ঢলের আগাম আঁচ পেয়েছিল স্পেন