ফোনের ওপাশে মানুষ নয়, কথা বলবে চ্যাটজিপিটি?

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১১ পিএম

ভাবুন, জরুরি প্রয়োজনে একটি হেল্পলাইনে ফোন করলেন। ওপাশ থেকে ভেসে এলো স্বাভাবিক, সাবলীল একটি কণ্ঠ। আপনি কথা বলছেন, প্রশ্ন করছেন, মাঝেমধ্যে থেমে যাচ্ছেন। অপর প্রান্তের কণ্ঠও আপনার কথার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। কোথাও দীর্ঘ বিরতি নেই, রোবটের মতো যান্ত্রিক উত্তরও নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যদি জানতে পারেন, ওপাশে কোনো মানুষই ছিলেন না?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্প্রতিক অগ্রগতি এমন বাস্তবতার সম্ভাবনাই সামনে নিয়ে আসছে। ভয়েস এআই এখন আর শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রযুক্তি নয়; মানুষের সঙ্গে প্রায় স্বাভাবিক গতিতে কথোপকথন করার সক্ষমতাও দ্রুত উন্নত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা ‘GPT-Live-1’ নামের একটি ভয়েস এআই সিস্টেম নিয়ে প্রযুক্তি অঙ্গনে এমনই দাবি করা হচ্ছে। এর সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো ফুল-ডুপ্লেক্স ভয়েস আর্কিটেকচার। অর্থাৎ ব্যবহারকারী কথা বলার সময়ই এআই তার বক্তব্যের অর্থ, কণ্ঠের ওঠানামা ও কথোপকথনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রতিক্রিয়া প্রস্তুত করতে পারে।

প্রচলিত ভয়েস বটের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন শেষ করার পর কিছুটা বিরতি দেখা যায়। তারপর শুরু হয় যান্ত্রিক কণ্ঠে উত্তর। ফলে ব্যবহারকারীর কাছে কথোপকথনটি অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হয় না। নতুন প্রজন্মের ভয়েস এআইয়ের লক্ষ্য সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা।

আপনি কথা বলছেন—হঠাৎ মাঝপথে থেমে গেলেন। কিংবা প্রশ্নের মাঝেই নতুন কোনো কথা মনে পড়ে গেল। এমনকি উত্তেজিত হয়ে আগের কথার ওপর নতুন কথা বললেন। উন্নত ভয়েস মডেলগুলো এসব পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে। ব্যবহারকারী কথা শুরু করলে এআই নিজের বক্তব্য থামিয়ে দিয়ে তার দিকে মনোযোগ দিতে পারে। মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথনে যে ধরনের ‘ইন্টারাপশন’ বা কথার মধ্যে ঢুকে পড়া ঘটে, প্রযুক্তিটিও সেটিকে অনুকরণ করার দিকে এগোচ্ছে। এখানেই ভয়েস এআইয়ের সঙ্গে পুরোনো চ্যাটবটের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট।

কাস্টমার কেয়ারে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে কল সেন্টার ও কাস্টমার সার্ভিসে। একটি প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবুন, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার গ্রাহক ফোন করেন। তাদের কেউ পণ্যের দাম জানতে চান, কেউ অর্ডারের অবস্থান জানতে চান, কেউ অভিযোগ করেন, আবার কেউ বিল বা অ্যাকাউন্ট নিয়ে সমস্যার সমাধান চান। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রতিষ্ঠানকে বড় একটি কাস্টমার কেয়ার টিম রাখতে হয়। ভয়েস এআই সেই জায়গায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

একটি এআই সিস্টেম একই সময়ে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। কর্মীদের ছুটি, অসুস্থতা, শিফট কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মতো বিষয়ও সেখানে প্রথাগত অর্থে প্রযোজ্য হবে না।

আরেকটি বড় বিষয় হলো খরচ

প্রযুক্তিটি যদি প্রতি মিনিটে মাত্র কয়েক টাকার সমপরিমাণ খরচে চালানো সম্ভব হয়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি প্রচলিত কল সেন্টার পরিচালনার তুলনায় আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা, অনলাইন শপ, খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা কোম্পানি এর মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে সার্বক্ষণিক কাস্টমার সাপোর্ট চালু করতে পারে।

একটি ছোট প্লাগইন বা সফটওয়্যার সংযোগ দিয়েই যদি হাজার হাজার গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা যায়, তাহলে ব্যবসার কাস্টমার কেয়ার ব্যবস্থার ধারণাটিই বদলে যেতে পারে।

মানুষকে কতটা ‘মানুষের মতো’ মনে হবে?

এখানেই প্রযুক্তিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের সময় শুধু শব্দের অর্থই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কণ্ঠের গতি, বিরতি, আবেগ, উত্তেজনা, দ্বিধা—সবকিছুই কথার অর্থকে প্রভাবিত করে। ভয়েস এআই এখন এসব সংকেত বোঝার দিকে এগোচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের কোনো কাস্টমার হয়তো ফোনের অপর প্রান্তে মানুষ নাকি এআই—তা প্রথম কয়েক মিনিটে বুঝতেই পারবেন না। তবে এখানেই প্রযুক্তির বড় প্রশ্নও রয়েছে।

মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো কথা বলতে পারা আর মানুষের মতো বিচারবুদ্ধি থাকা এক বিষয় নয়। কোনো গ্রাহক যদি জটিল আর্থিক সমস্যা, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা সংবেদনশীল কোনো বিষয়ে সাহায্য চান, সেখানে শুধু সাবলীল কথোপকথন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নির্ভুলতা, নিরাপত্তা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।

ব্যাংকিং ও গোপন তথ্যের ঝুঁকি

ভয়েস এআইয়ের ব্যবহার যত বাড়বে, তথ্য নিরাপত্তার প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ব্যাংকিং, চিকিৎসা, বিমা কিংবা সরকারি সেবার মতো ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে একটি এআই সিস্টেমকে শুধু দ্রুত ও সুন্দরভাবে কথা বলতে পারলেই হবে না; তথ্য সংরক্ষণ, পরিচয় যাচাই, অনুমতি ব্যবস্থাপনা এবং ভুল সিদ্ধান্তের দায়—সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে।

তাই প্রযুক্তির সক্ষমতা যতই চমকপ্রদ হোক, সংবেদনশীল তথ্যের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।

বাংলা ভাষায় কতটা প্রস্তুত?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই প্রযুক্তি বাংলা ভাষায় কতটা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে? শুদ্ধ প্রমিত বাংলা বোঝা এক বিষয়, আর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক উচ্চারণ, কথ্য ভাষা, শব্দের ব্যবহার ও আবেগ বোঝা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ঢাকার কথ্য বাংলা, সিলেটি, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা কিংবা বরিশালের টান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই উচ্চারণ ও শব্দ ব্যবহারে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সত্যিকারের স্থানীয় কাস্টমার কেয়ার এআই তৈরি করতে শুধু বাংলা ভাষা জানলেই হবে না; বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যও বুঝতে হবে।

বর্তমান প্রযুক্তি সেই পথে এগোলেও মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথনের পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে।

তাহলে কি কল সেন্টারের চাকরি শেষ?

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই। ভয়েস এআই নিঃসন্দেহে কল সেন্টারের অনেক কাজকে স্বয়ংক্রিয় করতে পারে। বিশেষ করে একই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অর্ডার ট্র্যাক করা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া, বিলের তথ্য দেওয়া কিংবা সাধারণ অভিযোগ গ্রহণের মতো কাজগুলোতে মানুষের প্রয়োজন কমতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ২০২৬ সালেই কল সেন্টারের সব চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বরং কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ এআই সামলাবে, আর জটিল অভিযোগ, বিশেষ পরিস্থিতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মানবিক যোগাযোগের প্রয়োজন হলে মানুষ যুক্ত হবে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের কল সেন্টারে হয়তো শত শত কর্মীর পাশাপাশি থাকবে শক্তিশালী ভয়েস এআই। কোনো গ্রাহক প্রথমে এআইয়ের সঙ্গে কথা বলবেন। সমস্যা জটিল হলে এআই তাকে মানুষের কাছে স্থানান্তর করবে। এই পরিবর্তনকে তাই শুধু ‘মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়া’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বরং এটি হতে পারে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার শুরু।

একসময় কম্পিউটার অফিসের কাজ বদলে দিয়েছিল। ইন্টারনেট বদলে দিয়েছিল যোগাযোগের পদ্ধতি। স্মার্টফোন মানুষের দৈনন্দিন জীবন পাল্টে দিয়েছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ তৈরি করছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়তো তখনই ঘটবে, যখন ফোনের অপর প্রান্তে থাকা কণ্ঠকে মানুষ আর প্রযুক্তি হিসেবে আলাদা করে চিনতে পারবে না।

সেদিন প্রশ্নটা হবে না—‘ওপাশে মানুষ নাকি এআই?’ প্রশ্ন হবে—‘মানুষের সঙ্গে কথা বলার কাজটুকুতে আমাদের আর কতটা মানুষ প্রয়োজন?’

এমইউ
আরও পড়ুন