ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের আকস্মিক ও দ্রুত সামরিক অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশটির শুষ্ক উপকূলীয় সমভূমি তিহামাহ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক দিনের মধ্যেই হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অনেক পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল হুথিবিরোধী জোট ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স’। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের অভিযানে ওই জোটের নিয়ন্ত্রণাধীন বড় একটি ভূখণ্ড হুথিদের হাতে চলে গেছে।
বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের উপকূলে সংগঠনটির সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই অগ্রযাত্রা কয়েক বছরের মধ্যে হুথিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্যগুলোর একটি। প্রায় ১২ বছর ধরে চলা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানের পরও হুথিদের যুদ্ধক্ষমতা যে অটুট রয়েছে, এই অগ্রযাত্রা তারই প্রমাণ দিয়েছে।
শুধু ভূখণ্ড দখল নয়, প্রতিপক্ষের মনোবলেও আঘাত করেছে হুথিদের দ্রুত অগ্রসর হওয়া। হুথিবিরোধী বাহিনীর মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে দখল করা অঞ্চলগুলো ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বলেছেন, হুথিরা এখন যেসব এলাকায় পৌঁছেছে, সেখানে তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করবে। তাদের সেখান থেকে সরাতে গেলে আগের তুলনায় অনেক বেশি সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
অর্থাৎ হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু সাময়িক ভূখণ্ড দখলের ঘটনা নাও হতে পারে। নতুন নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে অস্ত্র, যোদ্ধা ও সামরিক অবকাঠামো ছড়িয়ে দিয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের সমর্থন। হুথিরা একা এই লড়াই করছে না; তেহরানের কাছ থেকে তারা রাজনৈতিক, সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা পেয়ে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের কয়েকটি বড় ধাক্কার পর হুথিদের গুরুত্ব তেহরানের কাছে আরও বেড়ে গেছে।
ইরানের কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেবাননের হিজবুল্লাহ। গাজায় হামাস এবং সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ইরানের আঞ্চলিক প্রভাববলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সাম্প্রতিক সংঘাত ও সামরিক চাপের কারণে এসব মিত্রের অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনে হুথিদের শক্তি বৃদ্ধি তেহরানের জন্য নতুন কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকলে এর প্রভাব ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, এই নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুথিদের হাতে উপকূলের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা চলে গেলে ইরান-ইসরায়েল ও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেও তেহরানের হাতে নতুন একটি চাপ প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে হুমকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—হুথিদের এই অগ্রযাত্রা কোথায় গিয়ে থামবে। প্রতিপক্ষ যদি দ্রুত পাল্টা সামরিক শক্তি সংগঠিত করতে না পারে, তাহলে সাম্প্রতিক দখল করা অঞ্চলগুলোতে হুথিদের স্থায়ী অবস্থান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়বে।
আর যদি তারা বাব আল-মান্দাবের দিকে আরও এগিয়ে যায়, তাহলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে হুথিদের সাম্প্রতিক ঝড়ের গতির অগ্রযাত্রা শুধু ইয়েমেনের মানচিত্রই বদলাবে না, ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর যুদ্ধের কৌশলগত সমীকরণেও নতুন বিপজ্জনক অধ্যায় তৈরি করতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশবাসীর সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
ইসরায়েলি হামলার পর নাবাতিয়েহে লেবাননের প্রেসিডেন্ট
হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে: ইসমাইল বাঘাই