হরমুজে জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাত, জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ এএম

হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় একটি জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতের খবর পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) জাহাজটিতে প্রজেক্টাইল আঘাত হানার খবর তারা পেয়েছে। তবে হামলায় জাহাজটির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে কিংবা নাবিকেরা নিরাপদ আছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হরমুজে নতুন এই ঘটনার খবর এমন সময় এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। এর একদিন আগে সৌদি আরব নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা হিসেবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। সৌদি আরব ও ইরাক দুই দেশই জানিয়েছে, পাইপলাইনে হামলাটি ইরাক থেকে পরিচালিত ড্রোনের মাধ্যমে হয়েছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ও সৌদি তেল পরিবহন অবকাঠামোকে ঘিরে পরপর এসব হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। গত এক সপ্তাহেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

বিকল্প তেলপথও ঝুঁকিতে

প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল উৎপাদন এলাকা থেকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে। গত ছয় মাসে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ায় এই পাইপলাইন মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছিল।

পাইপলাইনটি প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করছিল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান। ফলে পাইপলাইনটি সচল থাকায় হরমুজকেন্দ্রিক অচলাবস্থার পুরো চাপ সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে পড়েনি।

তবে হামলার পর পাইপলাইনটি সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হামলার পর পাইপলাইনের মদিনার দক্ষিণাঞ্চলের একটি অংশ থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে উঠে এসেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোর কিছু ক্ষতি হয়েছে। রপ্তানির ওপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব কতটা, তা তখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছিল।

হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সম্ভাব্যভাবে দায়ী করেছেন।

হুথিদের হামলায় জাজানে হতাহত

এদিকে সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলেও হুথিদের হামলার খবর পাওয়া গেছে। সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে দুজন আহত হয়েছেন। কয়েকটি ভবন ও একটি মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরান-সমর্থিত হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও নৌবাণিজ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র দাবি করেছে, হুথিরা শুক্রবার বাব আল-মান্দাব প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। দ্বীপটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দাব একই সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা চাওয়া

পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে জানা গেছে। তিনটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক সহায়তা চান।

সূত্রগুলোর দাবি, ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সৌদি আরবকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে।

ট্রাম্প শনিবার সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, হুথিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।

ওয়াশিংটনের জন্য বিষয়টি এখন একটি কঠিন কৌশলগত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিলে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার সহায়তা না দিলে সৌদি তেল অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যপথে হামলা বাড়তে পারে।

হরমুজ নিয়ে বৈঠক, তবে সমঝোতা নিয়ে সংশয়

এদিকে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ওমানে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার অনুষ্ঠেয় বৈঠকে হরমুজের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।

তবে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় ধরনের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার ভাষ্য, ওমানের উদ্যোগে আয়োজিত বৈঠকে হরমুজসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, কিন্তু সেখানে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নেই।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজিও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আলোচনা বা সংলাপ অর্থহীন।

অন্যদিকে তাসনিম নিউজ এজেন্সির একটি সূত্র জানিয়েছে, সোমবারের বৈঠকে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের রুটসংক্রান্ত একটি সমঝোতা উপস্থাপন করা হতে পারে। ইরাকও বৈঠকে অংশ নেবে বলে জানা গেছে। তবে ইরানের দেওয়া সাতটি শর্ত যুক্তরাষ্ট্র পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না বলে ওই সূত্র দাবি করেছে।

হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতবিরোধও গভীর। ইরান চায়, প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হোক এবং এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের অধিকার তেহরান পাবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই অবস্থান মেনে নেয়নি। হরমুজের অপর পাড়ের ওমানও আলোচনায় সক্রিয় রয়েছে এবং দেশটি জানিয়েছে, আঞ্চলিক অন্য দেশগুলোর সম্মতি নিয়েই তারা সমঝোতার চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে হরমুজে জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাত, সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলা এবং বাব আল-মান্দাব ঘিরে হুথিদের অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। যুদ্ধের পরিধি যদি আরও বাড়ে, তাহলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই সামুদ্রিক জ্বালানি রুট একই সময়ে বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজ পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।

এএম
আরও পড়ুন