২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনায়ও আগ্রহ নেই বন্ধ কারখানার

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৬ এএম

অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে এখনো উদ্যোক্তাদের সাড়া মেলেনি। বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে ঋণ নিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো বড় বন্ধ কারখানা আবেদন করেনি।

গত ২৩ মে ঘোষিত এ কর্মসূচির তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঋণের আবেদন না আসায় বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান চালু করতে কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ খাতের মাধ্যমে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

৬০ হাজার কোটি টাকার পুরো প্যাকেজটি দুই অংশে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল হিসেবে গঠন করা হবে। তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এ অর্থের জোগান দেওয়ার কথা। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে, যা সরকারি গ্যারান্টির আওতায় থাকবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। ঋণের ভিত্তি সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। ব্যাংকগুলো এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ যোগ করতে পারবে। তবে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার হবে ৭ শতাংশ; বাকি ৬ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করবে। এ বাবদ বছরে সরকারের প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

প্রণোদনা কর্মসূচিতে বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় মেটাতে এ অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাত থেকে নয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরাঞ্চলকে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে উত্তরাঞ্চলের তহবিল ব্যবহারের কথা রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে আরও দেড় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকা থেকে আরও ১০টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রি-শিপমেন্ট ঋণে ৫ হাজার কোটি, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ৫ হাজার কোটি, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি এবং হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

এ ছাড়া বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি এবং বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি, পরিবেশবান্ধব পণ্যে ১ হাজার কোটি, সৃজনশীল অর্থনীতিতে ৫০০ কোটি এবং স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থ পাচার এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকটে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল হয়েছে। উচ্চ সুদহারও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে উৎপাদন কমেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধও হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করতে প্রণোদনা প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে।

তবে বন্ধ শিল্পের জন্য নির্ধারিত অর্থে এখনো কোনো বড় কারখানার আবেদন না আসার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, চলতি মাসের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো বড় বন্ধ শিল্পকারখানা ঋণের আবেদন করেনি। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। উদ্যোক্তারা হয়তো এখনো যাচাই-বাছাই করছেন, তাই আবেদন করতে সময় লাগছে। আবেদন পাওয়া গেলে দ্রুত ঋণ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হবে।

এদিকে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের ১০টি কারখানা গত মাসের ১ তারিখে বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কিছুটা কমলেও কারখানাগুলো চালু ছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক থেকে অর্থায়ন না পাওয়ার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিক ছাঁটাই বা কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে থাকতে পারে।

তবে কারখানাগুলো বন্ধের প্রকৃত কারণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকেই জানা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন আরিফ হোসেন খান। তার মতে, মালিকপক্ষের অনেকেই বর্তমানে দেশে নেই। তাই ব্যবস্থাপনায় থাকা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণ এবং অর্থায়নসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে তথ্য নেওয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, শুধু প্রণোদনা ঘোষণা করলেই বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। ঋণের শর্ত, জামানত, আগের ঋণের দায় এবং ব্যাংকের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে। বন্ধ কারখানাগুলো কেন ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছে না, তার কারণও খুঁজে দেখা জরুরি।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার জন্য আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুদের হার আরও কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান বাস্তবসম্মতভাবে চালু করা সম্ভব, সেগুলো যাচাই করে অর্থায়ন করা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে পুনরায় দাঁড়াতে পারবে না বলে মনে হলে সেখানে নতুন করে অর্থায়ন না করাই ভালো।

ফলে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ব্যবহার করে বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবিত করার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্যোক্তাদের আস্থা ও আগ্রহ তৈরি করা। একই সঙ্গে কোন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দ্রুত ফিরবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।

এমইউ
আরও পড়ুন