জেল নয়, বাড়িতেই সাজা কাটাবেন নাজিব রাজাক

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে বাকি কারাদণ্ডের মেয়াদ বাড়িতে থেকেই কাটানোর অনুমতি দিয়েছেন দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম। শুক্রবার দেশটির ফেডারেল টেরিটরিজ পারডন্স বোর্ডের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।

রাজপরিবারের দেওয়া এই শর্তসাপেক্ষ ক্ষমার আওতায় নাজিব ২০২৮ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত বাড়িতে থেকে সাজা ভোগ করতে পারবেন। তবে এর জন্য তাকে ৫০ মিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে এবং আরোপিত অন্যান্য শর্ত মেনে চলতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে এই ক্ষমা বাতিল হয়ে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হবে।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন

নাজিবের আবেদন নিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর পারডন্স বোর্ডের বৈঠক হয়েছিল। তখন তার আবেদন ভবিষ্যৎ বৈঠক পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। এক সপ্তাহ পর শুক্রবার আবার বৈঠক করে বোর্ড তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আইনবিষয়ক বিভাগ জানিয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বোর্ডের ৬৪তম বৈঠকে রাজা সুলতান ইব্রাহিম নাজিবকে শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা দেওয়ার অনুমোদন দেন।

কেন কারাগারে ছিলেন নাজিব?

৭৩ বছর বয়সী নাজিব ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল 1Malaysia Development Berhad (1MDB)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি মামলায় তিনি দণ্ডিত হন।

২০২০ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের অভিযোগে ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ২১০ মিলিয়ন রিঙ্গিত জরিমানা করা হয়। মামলাটি 1MDB-এর সাবেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান SRC International-এর ৪২ মিলিয়ন রিঙ্গিত অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ২০২২ সালের আগস্টে তিনি কারাদণ্ড ভোগ শুরু করেন।

২০২৪ সালে তৎকালীন রাজা নাজিবের সাজা ১২ বছর থেকে কমিয়ে ছয় বছর করেন এবং জরিমানাও ২১০ মিলিয়ন থেকে ৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতে নামিয়ে আনা হয়।

বাড়িতে থাকার বিতর্ক আগে থেকেই

নাজিব এর আগে দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের ক্ষমার সঙ্গে তাকে বাড়িতে থেকে সাজা ভোগের অনুমতি দেওয়া একটি অতিরিক্ত রাজকীয় আদেশও ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট সেই দাবির ভিত্তিতে করা আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত বলেছিল, কথিত ওই আদেশটি পারডন্স বোর্ডের বৈঠকে আলোচনা বা বিবেচনা করা হয়নি।

এরপর নাজিবের বাড়িতে থেকে সাজা ভোগের বিষয়টি নতুন করে পারডন্স বোর্ডের সামনে আসে। এবার বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই সুযোগ দেওয়া হলো।

আরও একটি ১৫ বছরের সাজা

তবে শুক্রবারের এই সিদ্ধান্তের অর্থ নাজিবের সব আইনি শাস্তি শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে 1MDB-সংশ্লিষ্ট আরেকটি মামলায় নাজিবকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারের অভিযোগে আরও ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তাকে ১১.৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত জরিমানাও করা হয়েছে। ওই রায় নাজিব আপিল করেছেন। ফলে শুক্রবারের রাজকীয় ক্ষমা মূলত তার আগের সাজাটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

1MDB কেলেঙ্কারি

1MDB ছিল মালয়েশিয়ার একটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল, যা নাজিব প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক তদন্তে তহবিল থেকে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়া ও বিভিন্ন দেশে পাচারের অভিযোগ উঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন দেশের তদন্তে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে।

এই কেলেঙ্কারি মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে নাজিবের নেতৃত্বাধীন জোট পরাজিত হয় এবং দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারায় পরিবর্তন আসে।

নাজিবের নতুন করে বাড়িতে সাজা ভোগের অনুমতি তাই শুধু একটি কারাদণ্ড পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি মালয়েশিয়ার রাজকীয় ক্ষমা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং 1MDB মামলাকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।

এমইউ
আরও পড়ুন