জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে যে কারণে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো এক লাখ ছাড়িয়েছে। চলতি বছর দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে—গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৭ হাজার ৯১৪ জন। এ নিয়ে টানা ৫৬ বছর জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বাড়ল। সরকারি হিসাবে, শতবর্ষীদের প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।

সংখ্যাটি একদিকে জাপানের দীর্ঘায়ু, উন্নত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু অন্যদিকে এটি দেশটির সামনে থাকা একটি গভীর জনমিতিক সংকটেরও চিত্র তুলে ধরছে—বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ শিশু জন্মের হার কমছে এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সংকুচিত হচ্ছে।

জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি বছর শতবর্ষী মানুষের মধ্যে ৯৪ হাজার ২৯৮ জন নারী এবং ১৩ হাজার ৩৭৯ জন পুরুষ। ১৯৬৩ সালে দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫৩ জন। ১৯৯৮ সালে তা ১০ হাজার ছাড়ায়, ২০১২ সালে ৫০ হাজারের বেশি হয় এবং এবার তা এক লাখের সীমা পেরিয়েছে।

জাপানের দীর্ঘায়ুর পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সাধারণত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার বিভিন্ন উপাদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ঐতিহ্যবাহী জাপানি খাদ্যতালিকায় মাছ, শাকসবজি ও ভাতের উপস্থিতি বেশি এবং অনেক পশ্চিমা দেশের তুলনায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কম। একই সঙ্গে হাঁটা, সাইকেল চালানো, গণপরিবহন ব্যবহার এবং বিভিন্ন ধরনের দলগত ব্যায়াম জাপানি সমাজে দীর্ঘদিনের অভ্যাস।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা। এর ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বলছে, চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান ও জীবনযাত্রার মানের উন্নতি মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

মানুষ বেশি দিন বাঁচছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক অর্জন। কিন্তু জাপানের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে অন্য জায়গায়।

দেশটিতে একই সঙ্গে জন্মহার কমছে এবং বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়ছে। ফলে একজন কর্মক্ষম মানুষকে ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পরিচর্যার ব্যয় বহন করতে হতে পারে।

জাপানের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের অনুপাত ছিল মোট জনসংখ্যার ২৯.১ শতাংশ। বর্তমান জনমিতিক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৭০ সালে এই হার প্রায় ৩৮.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৭ মিলিয়নে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের জাপানে শুধু বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে না, তাদের তুলনায় কর্মক্ষম মানুষের অনুপাতও কমে যাবে।

জাপানের জনসংখ্যাগত সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে জন্মহার।

দেশটির জন্মসংখ্যা ইতোমধ্যেই ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমেছে। ২০২৪ সালে জাপানে জন্ম হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৮৬ হাজার শিশু, যা প্রথমবারের মতো ৭ লাখের নিচে নামে। একই বছরে মোট প্রজনন হার নেমে দাঁড়ায় ১.১৫।

কম জন্মহারের পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। তরুণদের মধ্যে বিয়ে কমে যাওয়া বা দেরিতে বিয়ে, চাকরির অনিশ্চয়তা, স্থবির মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সন্তান পালনের উচ্চ ব্যয়—সবকিছু মিলেই পরিবার গঠন কঠিন হয়ে উঠছে।

নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বাড়লেও ঘর ও সন্তানের দায়িত্ব সবসময় সমানভাবে ভাগ না হওয়ায় কর্মজীবন ও মাতৃত্বের সমন্বয়ও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে থাকে।

সরকার শিশু ভাতা, সাশ্রয়ী বা ভর্তুকিযুক্ত শিশু পরিচর্যা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জন্মহার কমার প্রবণতা এখনো উল্টে যায়নি।

নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে কর্মী সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সমস্যা আরও প্রকট। তরুণদের বড় শহরে চলে যাওয়ার কারণে অনেক গ্রামে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ কাজ করার মতো মানুষের সংখ্যা কমছে।

এর ফলে শুধু অর্থনীতিই নয়, স্থানীয় হাসপাতাল, গণপরিবহন, দোকানপাট এবং অন্যান্য জনসেবার ওপরও চাপ বাড়ছে।

জাপানের সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ৯ কোটি বা তার নিচে নেমে যেতে পারে এবং তখন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের অনুপাত প্রায় ৩৯ শতাংশ হতে পারে।

কর্মী সংকট মোকাবিলায় জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়িয়েছে। বিদেশি জনসংখ্যাও বেড়েছে।

জাপানের এক লাখের বেশি শতবর্ষী মানুষ মানবসভ্যতার একটি অসাধারণ সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে—মানুষকে দীর্ঘ জীবন দেওয়ার পর সেই দীর্ঘ জীবনকে কীভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে টেকসই করা যাবে?

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত