মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই মন ভালো? যে ছোট অভ্যাসগুলো কমাতে পারে চাপ

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

মন খারাপ, অস্থিরতা কিংবা অতিরিক্ত চাপ কমাতে সবসময় দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান, ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করার প্রয়োজন হয় না। দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কিছু ছোট অনুশীলন মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণায় অতি স্বল্প সময়ের কিছু সুস্থতা অনুশীলন নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। এর কিছু মাত্র ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডেই করা সম্ভব। তবে এগুলো কোনো মানসিক রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। বরং দৈনন্দিন চাপ সামলানো এবং নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার ছোট অভ্যাস হিসেবে এগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।

১. হাসির অনুশীলন

হাসির জন্য সবসময় মজার ঘটনা বা কৌতুকের প্রয়োজন নেই। হাসির যোগব্যায়ামে ইচ্ছাকৃতভাবে হাসার অনুশীলন করা হয়। শুরুতে হাসি কৃত্রিম মনে হলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পরে তা স্বাভাবিক হাসিতে পরিণত হতে পারে।

অনুশীলনটি শুরু করতে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিন। এরপর হালকা করে হাসার চেষ্টা করুন। ‘হি হি হি’ বা ‘হা হা হা’ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে হাসির শব্দ বাড়াতে পারেন।

শেষে আবার গভীর শ্বাস নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকুন। হাসি ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

২. ২০ সেকেন্ডে নিজেকে ছুঁয়ে শান্ত করা

খুব সহজ একটি অনুশীলন হলো নিজের বুক বা বাহুতে আলতো করে হাত রাখা এবং কয়েক মুহূর্ত নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার চেষ্টা করা।

একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এমন আত্মসহানুভূতিশীল স্পর্শের অনুশীলন করতে বলা হয়। গবেষণাটিতে ৪৯৭ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ককে দুটি দলে ভাগ করে তিন ও ছয় মাস পর তাদের পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, অভ্যাস তৈরির কৌশল যুক্ত করা দলের অংশগ্রহণকারীরা অনুশীলনটি বেশি নিয়মিত করেছেন। একই সঙ্গে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীলতার মাত্রাতেও বেশি উন্নতি দেখা গেছে। ছয় মাসে মানসিক সমস্যার উপসর্গের ক্ষেত্রেও ওই দলের তুলনামূলক উন্নতি দেখা যায়। তবে মানসিক চাপের ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

এটি করতে এক বা দুই হাত বুকের ওপর কিংবা বাহুর ওপর আলতো করে রাখুন। ধীরে শ্বাস নিন। হাতের উষ্ণতা ও চাপ অনুভব করুন। মনে মনে নিজের প্রতি একটি সদয় কথা বলতে পারেন ‘আমি এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, নিজেকে একটু সময় দিচ্ছি।’

২০ সেকেন্ড দিয়েই শুরু করা যায়।

৩. ধীরে শ্বাস নেওয়া

চাপ বা উদ্বেগের মুহূর্তে সবচেয়ে সহজ অনুশীলনগুলোর একটি হলো ধীরে শ্বাস নেওয়া।

আরাম করে বসুন। চাইলে চোখ বন্ধ করতে পারেন। এরপর ধীরে শ্বাস নিন এবং শ্বাস ছাড়ার সময়টা একটু দীর্ঘ রাখুন। উদাহরণ হিসেবে প্রায় চার সেকেন্ডে শ্বাস নিয়ে ছয় সেকেন্ডে ছাড়তে পারেন। এভাবে কয়েকবার করুন।

ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস শরীরের এমন একটি স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শরীরকে তুলনামূলক শান্ত অবস্থায় ফিরতে সহায়তা করে।

তবে শ্বাসের অনুশীলনে অস্বস্তি, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে তা বন্ধ করা উচিত।

৪. ৩০ সেকেন্ডের ছোট যোগব্যায়াম

দিনের বেশির ভাগ সময় কম্পিউটার বা মুঠোফোনের সামনে বসে থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে টান তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ডের হালকা শরীর টানটান করার অনুশীলন উপকারী হতে পারে।

দুই হাত পেছনে নিয়ে আঙুলগুলো জড়াতে পারেন। শ্বাস নেওয়ার সময় হাত সামান্য নিচের দিকে প্রসারিত করে বুক খোলার চেষ্টা করুন। শ্বাস ছাড়ার সময় শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনুন।

দুই-তিনটি ধীর শ্বাসের সময় এই অবস্থান ধরে রাখতে পারেন।

তবে শরীরে ব্যথা থাকলে বা কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে নতুন ধরনের শরীর টানটান করার অনুশীলন শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

৫. হাঁটার সময় মনোযোগ দিন

অতি স্বল্প সময়ের অনুশীলন মানেই আলাদা করে বসে কোনো ব্যায়াম করা নয়। হাঁটার সময় কয়েক মুহূর্ত নিজের পায়ের নড়াচড়া, চারপাশের শব্দ এবং বাতাসের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া যায়।

অর্থাৎ হাঁটবেন, কিন্তু একই সময়ে মুঠোফোন দেখা বা অন্য চিন্তায় ডুবে না থেকে কয়েক মুহূর্ত শুধু হাঁটার অভিজ্ঞতাটি লক্ষ্য করবেন।

এ ধরনের সচেতন বিরতি দৈনন্দিন জীবনে সহজেই যুক্ত করা যায়।

৬. কাজের মাঝখানে ৩০ সেকেন্ডের বিরতি

কম্পিউটারে দীর্ঘ সময় কাজ করার সময় কিছুক্ষণ পরপর অল্প সময়ের বিরতি নেওয়া যেতে পারে।

চোখ পর্দা থেকে সরিয়ে দূরে তাকান। কাঁধ শিথিল করুন। ঘাড় সোজা করুন। কয়েকবার ধীরে শ্বাস নিন।

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই বিরতি শরীরকে একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার অভ্যাস থেকে বের করে আনতে সাহায্য করতে পারে।

৭. আসল বিষয় সময় নয়, নিয়মিত হওয়া

অতি স্বল্প সময়ের এসব অনুশীলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এর সময়সীমা নয়, বরং নিয়মিত করার সম্ভাবনা।

২০২৬ সালে ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, আত্মসহানুভূতিশীল স্পর্শের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়, স্থান, সংকেত এবং মুঠোফোনের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সুবিধার মতো অভ্যাস তৈরির কৌশল যুক্ত করলে অনুশীলনটি নিয়মিত করার প্রবণতা বাড়ে। গবেষণাটি ছয় মাস ধরে অংশগ্রহণকারীদের অনুসরণ করেছে।

অর্থাৎ ‘প্রতিদিন একবার করব’ বলার চেয়ে কোনো নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে অভ্যাসটি জুড়ে দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।

যেমন-দাঁত ব্রাশ করার পর ২০ সেকেন্ডের অনুশীলন, দুপুরের খাবারের আগে তিনবার ধীরে শ্বাস নেওয়া অথবা কম্পিউটারে কাজ শুরু করার আগে ৩০ সেকেন্ড শরীর টানটান করার অনুশীলন।

৮. ছোট অভ্যাস, বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

আধুনিক জীবনে অনেকেই মানসিক চাপ কমানোর জন্য দীর্ঘ সময় বের করতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বদলে কয়েক সেকেন্ডের ছোট অনুশীলন শুরু করার বাধা কম হতে পারে।

হাসি, ধীরে শ্বাস নেওয়া, হালকা শরীর টানটান করা কিংবা নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার মতো অনুশীলনগুলো তাই দৈনন্দিন রুটিনে সহজেই যুক্ত করা যায়।

তবে এগুলোকে মানসিক রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, ঘুমের গুরুতর সমস্যা বা অন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা থাকলে পেশাদার চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

এএম
আরও পড়ুন