দক্ষিণ আমেরিকায় মাদকবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী সম্ভাব্য সামরিক অভিযান জোরদারের প্রস্তুতি হিসেবে আফ্রিকায় মোতায়েন থাকা একাধিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন দক্ষিণ আমেরিকায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত ছয়টি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, আফ্রিকায় থাকা এসব ড্রোন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের অধীনে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানোর ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই এই স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিক কতটি ড্রোন আফ্রিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একজন সূত্র জানিয়েছেন, আফ্রিকা কমান্ডের অধীনে থাকা এমকিউ-৯ ড্রোনের অধিকাংশই দক্ষিণ আমেরিকাভিত্তিক কমান্ডের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে। আরও দুই সূত্রও জানিয়েছেন, এই ড্রোন স্থানান্তরের সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকায় সম্ভাব্য মাদকবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রস্তুতির সম্পর্ক রয়েছে।
এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভুল হামলা চালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ আমেরিকায় সম্ভাব্য অভিযান সামনে রেখে এই সক্ষমতা সেখানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রগুলোর বক্তব্য। সম্ভাব্য অভিযানের মধ্যে ইকুয়েডরও রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই ইকুয়েডর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশটির ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানকে সামরিকভাবে জোরদার করেছে। গত বছর ক্যারিবীয় অঞ্চলে এমকিউ-৯ ড্রোনের পাশাপাশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং অন্তত একটি এসি-১৩০ গানশিপ মোতায়েন করেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। সেসময় কথিত মাদকবাহী নৌযানকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়। এবার সেই কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করে দক্ষিণ আমেরিকার স্থলভাগেও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে আফ্রিকা থেকে ড্রোন সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যেই কিছু উদ্বেগ রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশে আইএসআইএস ও আল-শাবাবের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমলেও এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা ও যৌথ সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিএনএনের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আফ্রিকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ হচ্ছে না। তবে এমকিউ-৯-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম অন্য কমান্ডের কাছে সরিয়ে নিলে আফ্রিকায় গোয়েন্দা তৎপরতা ও হামলা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী কয়েকটি সামরিক সম্পদ হারিয়েছে, যার মধ্যে এমকিউ-৯ ড্রোনও রয়েছে। ফলে আফ্রিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া ড্রোনের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে কি না, সেটিও এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিরক্ষা কৌশলপত্রে মার্কিন ভূখণ্ড ও পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তাকে পেন্টাগনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থ ও কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আফ্রিকায় সামরিক তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। ফলে আফ্রিকা থেকে সামরিক সম্পদ সরিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে নেওয়ার বিষয়টি সেই অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে প্রাণঘাতী সামরিক হামলার আইনি ভিত্তি নিয়েও আগে প্রশ্ন উঠেছে। সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর একটি গোপন আইনি মতামত তৈরি করেছিল, যেখানে বিভিন্ন মাদক চক্র ও কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলার অনুমোদনের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। বিচার বিভাগের আইনবিষয়ক দপ্তরের ওই মতামত অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠী মার্কিন নাগরিকদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছে, এমন যুক্তিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছিল।
আগস্টে পানামায় অনুষ্ঠিত একটি যৌথ সম্মেলনে হেগসেথ ইকুয়েডর, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, জ্যামাইকা ও কলম্বিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার প্রশংসা করেন। এসব দেশের সঙ্গে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের কথাও তিনি তুলে ধরেন। কলম্বিয়া সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কলম্বিয়ার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহে ওই অঞ্চল সফরের সময় কলম্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের কথা বলেন। এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তিনটি এমকিউ-৯এ রিপার ড্রোন নেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছেন। এসব ড্রোন মাদক পাচারের পথ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে নির্ভুল হামলার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
পানামার সঙ্গেও ড্রোনভিত্তিক নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার দেশটির মার্কিন দূতাবাস জানায়, ছয় কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবস্থা পানামার কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এগুলো এমকিউ-৯ ড্রোন নয়। তবে এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দূরবর্তী সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং অবৈধ মাদক ও মানব পাচার নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় পানামার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে হামলা চালিয়ে আসছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। সিএনএনের হিসাবে এসব হামলায় অন্তত ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। তবে এসব হামলা আঞ্চলিক মাদক বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বাস্তব প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ সিএনএনকে বলেছেন, সমুদ্রপথে জব্দ করা কোকেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ মাদক পাচার কমে গেছে, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। পাচারকারী চক্রগুলো নতুন পথ বা নতুন কৌশল ব্যবহার করতে পারে। আরেকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, যেসব ধরনের নৌযানকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার লক্ষ্য করা হয়েছে, সাধারণত সেসব নৌযান দিয়ে বড় পরিসরে মাদক পাচার করা হয় না। ফলে এসব হামলার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অবশ্য কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। বেশ কয়েকটি নৌযান থামিয়ে সেগুলোর যাত্রী ও ক্রুদের নামিয়ে অংশীদার দেশগুলোর কাছে হস্তান্তরের পর নৌযানগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মার্কো রুবিও বলেছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনার কারণেই এই পরিবর্তন এসেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো দেশের জলসীমায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিযান চালাতে হয়।
তবে নৌযানে সরাসরি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর ক্যারিবীয় অঞ্চলে কথিত মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে তিনজন ক্রুকে হত্যা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক তৎপরতা আরও বাড়ানোর প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ঠিক কতটি ড্রোন স্থানান্তর করা হবে, সেগুলোর কত অংশ দক্ষিণ আমেরিকায় এবং কত অংশ অন্য অঞ্চলে ব্যবহার করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সূত্র: সিএনএন
মালিতে এক হামলায় শতাধিক সেনাকে হত্যা
যুদ্ধের আগুনে রাশিয়ার ডিজেল খাত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে: ডোনাল্ড ট্রাম্প
তুরস্ক ও পাকিস্তানকে কড়া হুঁশিয়ারি হুথিদের
নতুন অস্ত্রের ক্ষমতা শত্রুর কল্পনার বাইরে: আইআরজিসি মুখপাত্র
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকা চলবে না: অস্ট্রেলিয়া