ট্রাম্পের ‘ভুলের খেসারত’ ইউরোপের বিমানযাত্রীদের পকেটে: সাবেক ইরানি মন্ত্রী

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির সংকটের প্রভাব এবার ইউরোপের বিমান জ্বালানি বাজারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে ইউরোপে জেট ফুয়েলের দৈনিক ঘাটতি ৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Energy Aspects। একই সময়ে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি মজুত কেন্দ্র আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্পে (এআরএ) জেট ফুয়েলের মজুত সাত বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

এই পরিস্থিতিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইরানের সাবেক সড়ক ও নগর উন্নয়নমন্ত্রী মেহরদাদ বাজরপাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ তিনি লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের ভুলের খেসারত এখন বিমানের জ্বালানি ট্যাংক থেকে ইউরোপীয় যাত্রীদের পকেটে গিয়ে পড়ছে।’

বাজরপাশ আরও বলেন, হরমুজ সংকট ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তাকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। তার এই বক্তব্যকে ইরানের সাবেক এক মন্ত্রীর রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে; ইউরোপের জেট ফুয়েল সংকটের কারণ হিসেবে বাজার বিশ্লেষণে মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, দীর্ঘ দূরত্বের আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং কমে যাওয়া মজুতের কথা বলা হচ্ছে।

চতুর্থ প্রান্তিকে ৫.১ লাখ ব্যারেলের ঘাটতি
Energy Aspects-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ইউরোপের জেট ফুয়েল বাজারে দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর বিপরীতে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার ব্যারেল এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেল উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। অর্থাৎ সংকটটি শুধু উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন ঘটেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপকে এখন অনেক দূরের দেশ থেকে জেট ফুয়েল আমদানি করতে হচ্ছে। নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাড়ছে জ্বালানি আমদানি
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইউরোপে দক্ষিণ কোরিয়ার জেট ফুয়েল সরবরাহ দৈনিক গড়ে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেল হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরের পর এটি সর্বোচ্চ পর্যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায়ও জেট ফুয়েল উৎপাদন বেড়েছে। দেশটির জুলাইয়ের জেট ফুয়েল উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩৮৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়, যা সাত বছরের সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশটির জ্বালানি রপ্তানিও সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।

ফলে এশিয়ার পরিশোধনাগারগুলো এখন ইউরোপের সংকটের একটি অংশ পূরণ করছে। তবে এ ধরনের দীর্ঘ দূরত্বের সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় ও বাজারদরের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মজুত কমছে ইউরোপে
সংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ইউরোপের অভ্যন্তরীণ মজুত। এআরএ অঞ্চলে স্বাধীনভাবে সংরক্ষিত জেট ফুয়েলের মজুত ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে সাত বছরের সর্বনিম্নে নেমে যায়। এর অর্থ হলো, নতুন সরবরাহ আসতে কোনো কারণে বাধা তৈরি হলে ইউরোপের বিমান পরিবহন খাত দ্রুত চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ইউরোপকে একই সঙ্গে এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আরও বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করতে হতে পারে। এতে সরবরাহ চেইন দীর্ঘ হবে এবং পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

যাত্রীদের ওপর প্রভাব
জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়। বিমান পরিবহনের অন্যতম প্রধান ব্যয় হলো জ্বালানি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির ঘাটতি ও উচ্চমূল্য বজায় থাকলে বিমান সংস্থাগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ যাত্রীদের টিকিটের দামের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। তবে জেট ফুয়েলের ঘাটতি সরাসরি কত শতাংশ বিমানভাড়া বাড়াবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। বিমান সংস্থার হেজিং চুক্তি, জ্বালানি মজুত, রুট, প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও ভাড়ার ওপর প্রভাব ফেলে। তবে বাজারের বর্তমান প্রবণতা দেখাচ্ছে, ইউরোপের জন্য জেট ফুয়েল সংগ্রহ ক্রমেই বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে।

হরমুজ সংকটের বৈশ্বিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, পরিশোধিত জ্বালানি ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে জেট ফুয়েলের পাশাপাশি ডিজেলের বাজারেও চাপ বাড়ছে। ইউরোপীয় ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব এখন কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়া থেকে ইউরোপে জ্বালানি পরিবহনের নতুন রুট তৈরি হচ্ছে, সরবরাহকারীদের পরিবর্তন হচ্ছে এবং দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্য বাড়ছে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত