বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির নতুন এক সতর্কবার্তা সামনে এসেছে। চলতি বছরের শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ আগামী কয়েক মাসে অতিরিক্ত তাপ সৃষ্টি করে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোভিত্তিক Climate Impact Lab (CIL)।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে একটি স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লাখ ৫১ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। একই সময়ে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চরম গরমের দিন বাড়তে পারে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
তবে এই সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এটি নিশ্চিত মৃত্যুর হিসাব নয়। এটি তাপমাত্রা, স্থানীয় জনসংখ্যার ঝুঁকি এবং অতীতের তাপ-সংক্রান্ত মৃত্যুর সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস। গবেষণাটির পদ্ধতি এখনো peer-reviewed জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। ফলে বাস্তব মৃত্যুর সংখ্যা কম বা বেশি—দুই-ই হতে পারে।
Climate Impact Lab-এর গবেষকরা বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। স্থানীয় জলবায়ু, জনসংখ্যার ঝুঁকি এবং তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর অতীত তথ্যের সঙ্গে ভবিষ্যৎ তাপমাত্রার পূর্বাভাস মিলিয়ে তাঁরা হিসাব করেছেন, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এবারের এল নিনোর অতিরিক্ত তাপ কত মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই হিসাবের ভিত্তি হিসেবে ১৯৯৬–২০২৫ সালের গড় পরিস্থিতি ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ৪ লাখ ৫১ হাজার সংখ্যাটি ‘এল নিনোর কারণে পৃথিবীতে মোট কত মানুষ মারা যাবে’—এমন কোনো হিসাব নয়। বরং একই সময়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যতজন তাপজনিত কারণে মারা যেতে পারতেন, তার অতিরিক্ত সম্ভাব্য মৃত্যুর একটি মডেলভিত্তিক অনুমান।
Climate Impact Lab বলছে, শুধু তাপজনিত মৃত্যুর হিসাবই এতে অন্তর্ভুক্ত। এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য বন্যা, খরা, দাবানল, খাদ্যসংকট বা অন্যান্য দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যা এই ৪ লাখ ৫১ হাজারের মধ্যে ধরা হয়নি।
এল নিনো হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। এটি El Niño–Southern Oscillation বা ENSO-এর উষ্ণ পর্যায়। এর বিপরীত ঠান্ডা পর্যায় হলো লা নিনা।
সাধারণভাবে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে শক্তিশালী এল নিনোর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এবারের ঘটনাটি সেই তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
Berkeley Earth-এর আগস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাইয়ে Niño 3.4 সূচক প্রায় +২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল—বছরের এই সময়ের জন্য যা রেকর্ড পর্যায়ের উচ্চতা। বিভিন্ন মডেল নভেম্বর ২০২৬-এর দিকে সর্বোচ্চ মাত্রা প্রায় +৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
NOAA-এর Climate Prediction Center-ও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর সময়ে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং +২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি মাত্রার একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ বলে তাদের বর্তমান পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পূর্বাভাস আর নিশ্চিত ঘটনা এক বিষয় নয়। এল নিনোর চূড়ান্ত শক্তি ও তার আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল এলাকায় সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর তাপ ও আর্দ্রতার বিন্যাস পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ঝড় ও খরার ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে।
কোনো অঞ্চলে এর ফলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা ও খরা।
এ কারণেই শক্তিশালী এল নিনো শুধু ‘গরমের ঘটনা’ নয়। এটি বৈশ্বিক আবহাওয়ার একটি বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটাতে পারে।
Climate Impact Lab-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনোর সময়ে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অত্যন্ত গরম দিনের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি হতে পারে। গবেষকদের মতে, স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই অতিরিক্ত তাপ সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বয়স্ক মানুষ, শিশু, হৃদ্রোগ বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যারা দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করেন তাঁদের জন্য।
উচ্চ তাপমাত্রায় শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, কিডনির ওপর চাপ এবং হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়তে পারে। ফলে তাপপ্রবাহের সময় সরাসরি ‘হিটস্ট্রোক’ ছাড়াও বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
Climate Impact Lab-এর হিসাব বলছে, অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় বোঝা পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাইজেরিয়া, সুদান, নাইজার ও চাদ মিলিয়ে এ অঞ্চলে প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে—
নাইজেরিয়া: প্রায় ৩১,৪০০, ইন্দোনেশিয়া: প্রায় ১৯,৩০০, সুদান: প্রায় ১৭,৫০০–১৭,৬০০, নাইজার: প্রায় ১০,০০০, চাদ: প্রায় ৮,০০০, ভারত: প্রায় ১৫,৮০০, ব্রাজিল: প্রায় ১৩,৩০০
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৯,৪০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তাপমাত্রা বাড়লেও সব দেশের মানুষ একই মাত্রায় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, হাসপাতালের সক্ষমতা, জরুরি চিকিৎসা, তাপ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা এবং কর্মীদের সুরক্ষা—এসব সুবিধা মানুষের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে।
দরিদ্র দেশগুলোতে এসব ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। ফলে একই তাপমাত্রা ধনী ও দরিদ্র দেশের মানুষের ওপর ভিন্ন মাত্রার প্রভাব ফেলতে পারে।
Climate Impact Lab-এর গবেষকরাও বলেছেন, জরুরি প্রস্তুতি ও সম্পদ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে দ্রুত কেন্দ্রীভূত করা গেলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি কী?
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার বাইরে নয়। এল নিনোর প্রভাব কোনো দেশের ওপর ঠিক কীভাবে পড়বে, তা নির্ভর করে আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর। তাই শুধু বৈশ্বিক মৃত্যুর পূর্বাভাস দেখে বাংলাদেশে একই মাত্রার পরিস্থিতি হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্ক থাকার কারণ রয়েছে। Climate Impact Lab ভারতকে সম্ভাব্য উচ্চ-ঝুঁকির দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর এল নিনো যদি ২০২৭ সালের বসন্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয়, উত্তর গোলার্ধের পরবর্তী গ্রীষ্মে এর প্রভাব নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে তাই আগাম তাপ সতর্কতা, হাসপাতালের প্রস্তুতি, পানির ব্যবস্থা, শ্রমিক সুরক্ষা এবং শহরাঞ্চলে তাপ মোকাবিলার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতিই মূল কথা
সুপার এল নিনোর সম্ভাব্য ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু এটিকে ‘প্রলয়ের ভবিষ্যদ্বাণী’ হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না।
বরং গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—অনেক মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য হতে পারে।
Climate Impact Lab তাপপ্রবাহের আগে সতর্কবার্তা জারি, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়া, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে অতিরিক্ত কর্মী প্রস্তুত রাখা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র বা cooling centre তৈরি, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
এখানেই ৪ লাখ ৫১ হাজারের সংখ্যাটির প্রকৃত তাৎপর্য। এটি কতজন মারা যাবেন তার চূড়ান্ত হিসাব নয়; বরং কোথায় এবং কখন দ্রুত ব্যবস্থা নিলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব—তার একটি সতর্ক সংকেত।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক চক্র এবং একসময় তা দুর্বল হবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর উষ্ণতার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা থামছে না। ফলে এবারের সুপার এল নিনোকে শুধু একটি সাময়িক আবহাওয়াগত ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বড় শিক্ষা হারিয়ে যেতে পারে।
আজকের অস্বাভাবিক তাপ যদি আগামী কয়েক দশকের স্বাভাবিক তাপমাত্রার একটি নমুনা হয়, তাহলে প্রশ্নটি শুধু—‘এবার কতজন মারা যাবেন?’—এতটুকু নয়।
চীন থেকে ইরানে গেছে ১৩'শ চালান অস্ত্রের যন্ত্রাংশ
হোয়াইট হাউসে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ফেরানোর নির্দেশ
ভিসা ছাড়া মালয়েশিয়া ভ্রমণ: শর্ত কী, নিয়ম ভাঙলে কী শাস্তি?
এআই কী সত্যিই ব্যথা অনুভব করতে পারে?