ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞায় গাজায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য কার্যক্রম বিপর্যস্ত

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

গাজায় ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA)। তবে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ ও প্রবেশাধিকার সংকটের কারণে সংস্থাটির বিশাল সেবানেটওয়ার্কের বড় একটি অংশ এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের আগে গাজায় ইউএনআরডব্লিউএ-এর ২২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু ছিল। ২০২৬ সালের জুনে সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকর ছিল। পাশাপাশি চারটি ভাড়া করা স্থাপনা অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে সংস্থাটি মোবাইল মেডিকেল টিমও পরিচালনা করছিল।

এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ প্রয়োজন হলেও যুদ্ধ ও অবকাঠামোগত সংকট সেই সেবা ব্যাহত করছে।

ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত গাজায় তারা ১ কোটি ৮৭ লাখের বেশি স্বাস্থ্যসেবা ভিজিট দিয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত সংস্থাটির স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মেডিকেল পয়েন্টগুলোতে ৭৩ হাজারের বেশি চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সময়ে গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের জন্য হাজার হাজার পরামর্শ এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।

সরাসরি ত্রাণ আনতে পারছে না ইউএনআরডব্লিউএ

শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও UNRWA বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় ইউএনআরডব্লিউএ-এর মানবিক কর্মী ও ত্রাণ সরাসরি প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে। ফলে সংস্থাটিকে গাজার বাইরে মজুত থাকা ত্রাণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ইউএনআরডব্লিউএ-এর ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধের আইনি ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে। ইউএনআরডব্লিউএ-এর আন্তর্জাতিক কর্মীদের গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রবেশের অনুমতিও দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হয়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে গাজায় ইউএনআরডব্লিউএ-এর ২২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল। শিক্ষা খাতেও সংস্থাটির বড় উপস্থিতি ছিল ২৮৪টি স্কুলে প্রায় ৩ লাখ নিবন্ধিত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত এবং ১০ হাজারের বেশি শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে কাজ করতেন।

শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী সংকট

গাজার শিক্ষা ব্যবস্থাও যুদ্ধের কারণে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বহু শিক্ষার্থী আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও তাদের অনেককেই তাঁবু, অস্থায়ী কাঠামো কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইউনিসেফের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে UNRWA অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র ও অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে সংস্থাটি জানিয়েছিল, ৫৮ হাজারের বেশি শিশু ইউএনআরডব্লিউএ-এর ৭৮টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিচালিত ৬৮৭টি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিশুকে মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগও চলছিল।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বাইরে আরও বড় মানবিক সংকট

ইউএনআরডব্লিউএ-এর কার্যক্রম সীমিত হওয়ার প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আটকে নেই। খাদ্য, আশ্রয়, পানি, স্যানিটেশন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও সংস্থাটি গাজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সেবাদাতা।

২০২৬ সালের জুনের UNRWA প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্থাটির ৩১২টি স্থাপনা যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা সংঘাতের প্রভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আশ্রয়কেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইউএনআরডব্লিউএ-এর স্বাস্থ্যকর্মীরা এখনো মোবাইল মেডিকেল টিমের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। খান ইউনিস, আল-মাওয়াসি, মধ্য গাজা ও গাজা সিটিতে এসব মোবাইল টিমের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে থাকা রোগীদের কাছে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।

গাজার মানুষের জন্য এর অর্থ কী

ইউএনআরডব্লিউএ-এর কার্যক্রম সীমিত হওয়া গাজার মানুষের জন্য একটি বড় মানবিক শূন্যতা তৈরি করছে। কারণ যুদ্ধের আগে যে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল ও সহায়তা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ সেবা পেতেন, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রবেশাধিকার সংকটে সেই অবকাঠামোর বড় অংশ এখন আর আগের মতো কাজ করছে না।

বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগী, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসা, ওষুধ ও টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখাও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

তবে সংকটের মধ্যেও UNRWA স্বাস্থ্যসেবা, অস্থায়ী শিক্ষা এবং ডিজিটাল শিক্ষার মতো বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে গাজায় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান পরিস্থিতি তা স্পষ্ট করে তুলছে।

এএম
আরও পড়ুন