নিরক্ষরেখার খুব কাছেই একসময় সারা বছর বরফে ঢাকা থাকত পাহাড়ের চূড়া। শত শত বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া অঞ্চলের সুডিরমান পর্বতমালার ওপর জমে থাকা সেই বরফ স্থানীয় মানুষের কাছে ছিল প্রকৃতির এক বিস্ময়, আবার বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল পৃথিবীর জলবায়ুর অতীতের এক মূল্যবান দলিল।
কিন্তু সেই ‘চিরতুষার’ এখন প্রায় শেষ।
অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে অবস্থিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ নিউগিনির ইন্দোনেশীয় অংশ পাপুয়া। নিরক্ষরেখা থেকে মাত্র প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত সুডিরমান পর্বতমালা। এক শতাব্দী আগেও প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পর্বতমালার চারটি প্রধান চূড়ায় স্থায়ী বরফ ও তুষার দেখা যেত।
এখন সেই বরফের সামান্য অংশই টিকে আছে পুঞ্চাক জয়া বা কার্স্টেনজ পিরামিডের আশপাশে। গবেষকদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট তুষারও এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
এক শতাব্দীতে হারিয়ে গেল বিশাল বরফভূমি
পুঞ্চাক জয়ার আশপাশের হিমবাহের আয়তন উনিশ শতকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর ছিল। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র প্রায় ১৬ হেক্টরে। অর্থাৎ কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানেই বিশাল বরফভূমির প্রায় সম্পূর্ণটাই হারিয়ে গেছে।
চেক প্রজাতন্ত্রের হিমবাহবিষয়ক গবেষক মারি শাবাচা গত মার্চে পুঞ্চাক জয়া সফর করেন। উদ্দেশ্য ছিল পাপুয়ার ‘চিরতুষার’-এর শেষ পর্যায়ের পরিবর্তনগুলো নথিভুক্ত করা এবং যতটা সম্ভব বরফের নমুনা সংগ্রহ করা।
গবেষকদের কাছে পাপুয়ার এই হিমবাহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আন্দিজ ও হিমালয়ের মতো বড় হিমবাহ অঞ্চলের থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতম জলভাগের একটি ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ জলভাগের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার জন্য এখানকার বরফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বরফের ভেতর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অতীত
হিমবাহের বরফ শুধু পানি নয়; এর ভেতরে আটকে থাকে অতীতের বায়ুমণ্ডলের নানা সংকেত। বরফের গভীর স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা অতীতের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের অবস্থা এবং জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। পুঞ্চাক জয়ার বরফেও সেই ইতিহাস সংরক্ষিত ছিল।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে বিজ্ঞানীরা বরফের এই প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার পুরোপুরি গবেষণা করার আগেই তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৯৩৬ সালের ছবিতে পুঞ্চাক জয়ার চারপাশে যে বিস্তৃত তুষারভূমি দেখা যায়, বর্তমানে তার সঙ্গে দৃশ্যপটের পার্থক্য স্পষ্ট।
ডেনমার্কের গবেষক ক্লাউস থাইমান ও তাঁর দল আকাশ থেকে তোলা ছবি, ড্রোন এবং ত্রিমাত্রিক মানচিত্র ব্যবহার করে অবশিষ্ট বরফের পরিমাণ নথিভুক্ত করছেন। তাঁর হিসাবে, ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের হিমবাহ আচ্ছাদিত এলাকা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমেছে।
কেন গলে যাচ্ছে পাপুয়ার বরফ?
গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ পৃথিবীর উষ্ণ হয়ে ওঠা। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বাড়ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসের পরিমাণও বেড়েছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ে তুষার জমার সীমারেখাও আরও ওপরে উঠে যাচ্ছে।
ফলে আগে যেখানে তুষারপাত হতো, এখন সেখানে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে এই পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র। পাপুয়ার পাহাড়গুলো নিরক্ষরেখার খুব কাছাকাছি হওয়ায় স্থায়ী বরফ টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত নির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ জলবায়ু পরিস্থিতি।
তাপমাত্রায় সামান্য পরিবর্তন, তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত কিংবা বরফ জমার উচ্চতা কিছুটা ওপরে উঠে যাওয়া যেকোনো একটি কারণই একটি হিমবাহের অস্তিত্বের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনাও বরফ গলার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে পারে। পাশাপাশি মেঘের পরিমাণ, তুষারপাতের মাত্রা এবং পাহাড়ের গঠনও এতে ভূমিকা রাখে।
শুধু বরফ নয়, হারিয়ে যাচ্ছে একটি সংস্কৃতির অংশ
পাপুয়ার বরফ গলে যাওয়া শুধু পরিবেশগত পরিবর্তনের ঘটনা নয়। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই পাহাড়ের রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। অন্তত পাঁচটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পুঞ্চাক জয়ার দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।
মোনি জনগোষ্ঠী পাহাড়টিকে ‘মবাইঙ্গেলা’ নামে অভিহিত করে। তাদের বিশ্বাস, পূর্বপুরুষেরা পাহাড়টির ওপর থেকে তাদের দেখভাল করেন। আমুংমে জনগোষ্ঠীর কাছে পর্বতমালাটির নাম ‘নেমাংকাউই’ অর্থাৎ ‘সাদা তীর’।
স্থানীয় আমুংমে নারী এলফ্রিদা নাটকিমের ভাষায়, তাঁদের বাবা-মা ও দাদা-দাদিরা সন্তানদের এমন হৃদয়ের জন্য প্রার্থনা করতেন, যা ‘সাদা তীর’-এর মতো সঠিক পথ থেকে কখনো বিচ্যুত হবে না। তাঁদের কাছে এই পাহাড় সততা, পবিত্রতা ও নৈতিকতার প্রতীক।
পরিবেশকর্মী অ্যাডলফিনা কুম বলেন, আমুংমে জনগোষ্ঠীর কাছে নেমাংকাউই ধ্বংস হয়ে যাওয়া অনেকটা মুসলমানদের কাছে মক্কা কিংবা ক্যাথলিকদের কাছে রোম বা ভ্যাটিকান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো।
অর্থাৎ বরফ হারানো মানে শুধু একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের পরিবর্তন নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আধ্যাত্মিক ভিত্তির ওপরও আঘাত।
খনিজ সম্পদ বদলে দিয়েছে পাহাড়ের চেহারা
পাপুয়ার এই পাহাড়ি অঞ্চল শুধু বরফের জন্যই পরিচিত নয়। বিশাল তামা ও সোনার মজুদ আবিষ্কারের পর বিংশ শতাব্দীতে এই অঞ্চল ব্যাপক শিল্প কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
খনি সম্প্রসারণের ফলে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ খনন করা হয়েছে। তৈরি হয়েছে সড়ক, শিল্প অবকাঠামো ও বসতি। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, খনি ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কর্মসংস্থান, সড়ক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার একই সঙ্গে পরিবেশের ক্ষতি, সামাজিক সংঘাত এবং পূর্বপুরুষের জমিতে প্রবেশাধিকার হারানোর মতো সমস্যাও তৈরি হয়েছে।
পাপুয়ার গ্রাসবার্গ খনি পরিচালনাকারী ফ্রিপোর্টের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
এলফ্রিদা নাটকিমের অভিজ্ঞতাতেও এই দ্বৈত বাস্তবতা ফুটে ওঠে। তাঁর ভাষায়, পাহাড় দেখলে এখনও বিস্মিত হন তিনি, কিন্তু একই সঙ্গে দুঃখও হয়। তাঁর মতে, কোম্পানি আসার পর তিনি ভূমির ওপর ব্যাপক পরিবর্তন ও শোষণ দেখেছেন, যদিও উন্নয়ন অনেক মানুষের জীবিকার সুযোগও তৈরি করেছে।
শেষ বরফটুকু সংরক্ষণের চেষ্টা
পাপুয়ার পাহাড়ে এখন বিজ্ঞানী, গবেষক ও অভিযাত্রীরা যেন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। ড্রোন, আকাশচিত্র ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্রের মাধ্যমে অবশিষ্ট বরফের প্রতিটি অংশ নথিভুক্ত করা হচ্ছে। কারণ কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো সেই বরফ আর থাকবে না।
গবেষকদের কাছে এই হিমবাহ পৃথিবীর উষ্ণায়নের একটি দৃশ্যমান প্রমাণ। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এর অর্থ আরও গভীর এটি তাঁদের পূর্বপুরুষ, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ভূমির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক।
ক্লাউস থাইমানের ভাষায়, মানুষ যখন শোনে এমন কিছু, যাকে ‘চিরন্তন’ বলা হয়, সেটিও হারিয়ে যাচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
অ্যাডলফিনা কুমের কথায়, পবিত্র পাহাড়, বন কিংবা পূর্বপুরুষের ভূমি নষ্ট হলে একটি জনগোষ্ঠী তার শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হারায়।
তিনি বিষয়টিকে একটি গাছের শিকড় উপড়ে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেন শিকড় উঠে গেলে গাছ যেমন তার ভিত্তি হারায়, তেমনি পবিত্র ভূমি হারালে একটি জনগোষ্ঠীও তার সাংস্কৃতিক ভিত্তি হারাতে পারে।
পুঞ্চাক জয়ার বরফ তাই কেবল বরফ নয়। এটি পৃথিবীর জলবায়ুর অতীতের এক প্রাকৃতিক নথি, ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং পাপুয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের পরিচয় ও বিশ্বাসের একটি জীবন্ত প্রতীক।
আর সেই প্রতীক এখন গলে যাচ্ছে নিরক্ষরেখার কাছেই, মানুষের চোখের সামনে।
এআইকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
হরমুজে জাহাজ চালালে চার্টারারদেরও নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি ইরানের
এআই দিয়ে ঝকঝকে খাবারের বিজ্ঞাপন: স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন আশঙ্কা
কানাডায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৪
'ছাত্রশিবিরকে ভয় দেখাও, আমরা এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না'