পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরকে চারদিক থেকে চেপে ধরেছে ইরান যুদ্ধ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া, বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সুয়েজ খালে বাণিজ্যিক চাপ সব মিলিয়ে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের মতো দেশগুলো একই সঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন ও নিরাপত্তাজনিত চাপের মুখে পড়ছে।

তিন দেশের অবস্থান অবশ্য এক নয়। পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ও উপসাগরীয় বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল; তুরস্ক ইরান ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থল করিডর হিসেবে নতুন সুযোগ পেলেও সীমান্তে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে; আর মিসরের বড় উদ্বেগ সুয়েজ খাল ও বৈদেশিক মুদ্রার আয় নিয়ে।

ইরান যুদ্ধের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি পাকিস্তানের জন্য জ্বালানি সরবরাহ। দেশটির অর্থনীতি উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও বাণিজ্যের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল ও গ্যাস পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে পাকিস্তানের আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে।

পাকিস্তানের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমিক অল্টারনেটিভস (পিআইডিই)-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ বন্ধ থাকলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে পাকিস্তানের আমদানি প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে দেশটির আমদানি বিল প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাকিস্তানের রপ্তানিও ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার কমার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এর অর্থ হলো, পাকিস্তান একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক-তিন দেশই স্থলপথে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইরানের সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পাকিস্তান ও তুরস্কের সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহন বেড়েছে। ফলে সীমান্ত অবকাঠামোর ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

ইরানের জন্য তুরস্ক এখন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বাণিজ্যপথগুলোর একটি। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়ায় ইরান স্থলপথে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

কিন্তু এর ফল তুরস্কের সীমান্ত অবকাঠামোতেও পড়ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তুরস্ক-ইরান সীমান্তের গুরবুলাক ক্রসিংয়ে শত শত ট্রাক আটকে থাকার কথা উঠে এসেছে। একপর্যায়ে প্রতিদিনের ট্রাক চলাচল প্রায় ২০০ থেকে বেড়ে ১,২০০-তে পৌঁছায় এবং অপেক্ষার সময় ২৫ দিন পর্যন্ত হয়েছে বলে Associated Press জানিয়েছে।

তুরস্কের জন্য এটি একদিকে বাণিজ্যিক সুযোগ। ইরানের বিকল্প আমদানি-রপ্তানি রুট হিসেবে তুরস্কের গুরুত্ব বাড়ছে। অন্যদিকে সীমান্তে যানজট, জ্বালানি ব্যয়, কাস্টমস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

তুরস্ক আবার একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার হচ্ছে। গত সপ্তাহে সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক প্রধানরা রিয়াদে বৈঠক করে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

অর্থাৎ তুরস্ককে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভূমিকা রাখতে হচ্ছে।

মিসরের জন্য সংকটটির কেন্দ্রবিন্দু সুয়েজ খাল। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ এই খাল। কিন্তু হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা সংকটের কারণে জাহাজ চলাচলে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব সুয়েজ খালেও পড়ে।

জাহাজ মালিকরা যদি নিরাপত্তাজনিত কারণে দীর্ঘতর বিকল্প রুট বেছে নেয়, তাহলে সুয়েজ খাল থেকে মিসরের আয় কমতে পারে। এর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে মিসরের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর দ্বৈত চাপ তৈরি হয়।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং মিসরের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ নিয়ে ইতোমধ্যেই বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। Washington Institute-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে তেলের বাজার ও মিসরের রাজস্বপ্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ায় দেশটির মুদ্রার স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

মিসরের জন্য আরও একটি সমস্যা হলো দেশটির অর্থনীতি পর্যটন, রেমিট্যান্স, সুয়েজ খাল এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের মতো বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এসব খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ বাড়তে পারে।

বর্তমান সংকটকে শুধু হরমুজ প্রণালির সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সামুদ্রিক করিডর হরমুজ, বাব আল-মান্দাব এবং সুয়েজ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

হরমুজে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে। বাব আল-মান্দাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে জাহাজকে দীর্ঘতর রুট নিতে হতে পারে। আর সুয়েজে জাহাজ চলাচল কমলে মিসরের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ কারণে একটি যুদ্ধ একই সঙ্গে তিনটি দেশের অর্থনীতিতে তিন ধরনের চাপ তৈরি করছে পাকিস্তানে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়, তুরস্কে স্থলবাণিজ্য ও সীমান্ত অবকাঠামো, আর মিসরে সুয়েজ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির উচ্চমূল্য, বাণিজ্য বিঘ্ন, পর্যটন ও পরিবহন খাতে ধাক্কা এবং আর্থিক বাজারের অস্থিরতা আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের পর ইরান সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে স্থল ও রেলপথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। রাশিয়া থেকে ক্যাস্পিয়ান সাগর হয়ে পণ্য আনা এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাধ্যমে ট্রাকযোগে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনে রেলপথে তেল পাঠানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।

কিন্তু বিকল্প পথ মানেই সংকটের সমাধান নয়। স্থলপথে পরিবহন সাধারণত বেশি ব্যয়বহুল এবং সীমান্ত অবকাঠামোর সক্ষমতা সীমিত। তুরস্ক-ইরান সীমান্তে ট্রাকের দীর্ঘ সারি তারই একটি উদাহরণ।

অর্থাৎ ইরান সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিবহন অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

পাকিস্তানের জন্য প্রধান প্রশ্ন জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যয়। তুরস্ককে সামলাতে হচ্ছে সীমান্ত বাণিজ্যের বাড়তি চাপ এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা। মিসরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সুয়েজ খাল থেকে রাজস্ব কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও তীব্র হওয়া।

এই তিন দেশের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। একটি প্রণালির নৌ অবরোধ থেকে শুরু হওয়া সংকট এখন স্থলসীমান্ত, রেলপথ, জ্বালানি বাজার, বন্দর, সুয়েজ খাল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একই সঙ্গে প্রভাবিত করছে।

সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হলে এই চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে হরমুজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম কোন পর্যায়ে থাকে এবং আঞ্চলিক দেশগুলো বিকল্প বাণিজ্যপথ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে তার ওপর। বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চললেও হরমুজ পুনরায় পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত