সুন্দরবন ঘেঁষে ১৮ রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ, উচ্ছেদ হচ্ছে অবৈধ ঘের

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৪ এএম

সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের মধ্যে এবং নতুন তৈরি হওয়া আটটি রিসোর্টকে ১৫ দিনের মধ্যে সব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন থেকে অবৈধ চিংড়ি ঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গত রোববার (৪ অক্টোবর) পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ রিসোর্ট মালিকদের লিখিতভাবে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্দেশনা না মানলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিয়মিত মামলা করাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্ধের নির্দেশ পাওয়া রিসোর্টগুলোর মধ্যে রয়েছে অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর সমকালে ‘রিসোর্ট ব্যবসার চাপে সুন্দরবন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুন্দরবনের চারপাশে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়টি উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে অবৈধভাবে বন ও খালে পর্যটকদের চলাচল, ডলফিন অভয়ারণ্য ঘোষিত ঢাংমারী খাল দিয়ে পর্যটকবাহী ট্রলারের অবাধ যাতায়াত এবং এর ফলে সুন্দরবনের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এর পরই অনুমোদনহীন রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয় পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, সুন্দরবনের ঢাংমারী, কৈলাসগঞ্জ ও বাণিশান্তা এলাকায় ১৮টি রিসোর্ট রয়েছে। এগুলো খুলনা জেলা কার্যালয়ের আওতাধীন হওয়ায় পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে চিলা, বৈদ্যমারী ও চাঁদপাই বাগেরহাট জেলার মধ্যে পড়ায় সেসব এলাকার রিসোর্টের তথ্য তাদের কার্যালয়ে নেই।

তিনি জানান, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট নির্মাণ করায় এর আগে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। জবাবে প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদনের জন্য আবেদন করলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে পারেনি। ফলে গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের আবেদন বাতিল করা হয়। এরপর সব প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন করে তৈরি হওয়া আটটি রিসোর্টকে সাত দিনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্থানে সরিয়ে নিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তাদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা না যাওয়ায় এখন সাত দিনের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ এবং ১৫ দিনের মধ্যে সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন বা প্যারাবন থেকে অবৈধ চিংড়ি ঘের উচ্ছেদেও বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ কাজে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এখন উচ্ছেদ অভিযানের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব এমওইএফসিসি, ডিওই অ্যান্ড বিএফডি ফর ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইমপ্রুভড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম শুরু হবে।

তবে দীর্ঘদিনের দখল, প্যারাবন উজাড় এবং খালে বাঁধ দিয়ে চিংড়ি চাষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সোনাদিয়ায় শুধু অবৈধ ঘের উচ্ছেদ করলেই আগের পরিবেশ ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবেশবিদদের। তাদের মতে, ঘের উচ্ছেদের পাশাপাশি ধ্বংস হওয়া প্যারাবন পুনরুদ্ধার, জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং অভিযান শেষে আবার যাতে নতুন করে দখল না হয়, সে জন্য কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

নদীগবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা করা হলে তা আগের উদ্যোগগুলোর তুলনায় কার্যকর হতে পারে। তবে উচ্ছেদের পর নজরদারি না থাকলে আবারও দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সোনাদিয়াকে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখতে বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন।

এর আগে গত বুধবার সমকালে ‘সোনাদিয়ার প্রাণ যায় যায়’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্বীপটির পরিবেশ ও প্যারাবন ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরা হয়।

জানা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সোনাদিয়ায় অন্তত ছয় হাজার একর প্যারাবন কেটে ৫০টি চিংড়ি ঘের গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সোনাদিয়ার প্রায় ৯ হাজার একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) বরাদ্দ দেওয়ার পর থেকেই প্যারাবন কাটার প্রবণতা ব্যাপক আকার নেয়। ওই সময় সোনাদিয়ার প্যারাবন রক্ষার আইনি কর্তৃত্ব হারায় বন বিভাগ।

গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর মহেশখালীর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ও সংরক্ষিত বনে চিংড়ি ঘের এবং লবণ মাঠ তৈরিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের একজন সচিবসহ ১০ সরকারি কর্মকর্তাকে লিগ্যাল নোটিশ দেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)। বেলার আইনজীবী এস হাসানুল বান্নার পাঠানো ওই নোটিশে বলা হয়, সোনাদিয়া দ্বীপে প্যারাবন ধ্বংস করে অন্তত ৫০টি চিংড়ি ঘের তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ও বড় মহেশখালী মৌজায় তৈরি হয়েছে ১৫টি ঘের।

প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফাহমিদা হক জানান, সোনাদিয়ার অবৈধ দখল উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। গত ৩ আগস্ট সেই প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেন।

তিনি বলেন, সোনাদিয়ার অবৈধ চিংড়ি ঘের উচ্ছেদ অভিযানে নৌবাহিনীর প্রায় চার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে এ কাজের জন্য বরাদ্দ রয়েছে দুই কোটি টাকা। এ বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠকের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সেক্রেটারি (বাপা) মো. আলমগীর কবির বলেন, সোনাদিয়াকে শুধু অবৈধ ঘেরমুক্ত করলেই হবে না, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনাও নির্ধারণ করতে হবে। কোন সংস্থা কীভাবে বনভূমি রক্ষা করবে, কোথায় পুনর্বনায়ন করা হবে, কোন কোন খাল পুনর্খনন বা বাঁধমুক্ত করা হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

মহেশখালীর ইউএনও ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, সোনাদিয়ায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌযান। এ কারণে অবৈধ দখল উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত