ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধ, জেলেনস্কির পাশে ব্রিটেন

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরোধের মধ্যে ইউক্রেন ও জেলেনস্কির পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষমতাও তার হাতে, কিন্তু তিনি তা করতে চাইছেন না। একই সঙ্গে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল কেনার বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত চুক্তি এবং জেলেনস্কিকে ক্ষমতা ছাড়ার পরামর্শ দেওয়ার বক্তব্য ঘিরে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন বেড়েছে।

রোববার (১১ অক্টোবর) বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং বলেন, যুদ্ধের আগ্রাসী পক্ষ যে পুতিন, তা নিয়ে যুক্তরাজ্যের কোনো সন্দেহ নেই। তার ভাষায়, পুতিনই এই যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং চাইলে আগামীকালই তা শেষ করতে পারেন। কিন্তু তিনি যুদ্ধ বন্ধ করছেন না। এ কারণেই যুক্তরাজ্য ইউক্রেন ও জেলেনস্কির পাশে রয়েছে বলে জানান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

ট্রাম্পের মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক চাপও কাজ করতে পারে বলে মনে করেন স্ট্রিটিং। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু। জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর চাপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও অনুভব করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে অতিরঞ্জিত বক্তব্য না দেওয়ারও আহ্বান জানান স্ট্রিটিং।

গত শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, রাশিয়ার কাছ থেকে তিন লাখ টন জ্বালানি কেনার একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি চুক্তিটিকে পুতিনের জন্য উপহার বলে আখ্যা দেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, এ ধরনের চুক্তি রাশিয়ার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

এরপর রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি জেলেনস্কিকে হামলা বন্ধ করতে বলেন এবং এমন একজন নতুন নেতা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন, যিনি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন হামলা বন্ধ না করলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর শনিবার জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ওই আলোচনায় তিনি ইউক্রেনের প্রতি পূর্ণ সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেন। দুই নেতা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরাসরি বৈঠক করার বিষয়েও একমত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এদিকে জেলেনস্কি রোববার বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করলে কিয়েভও রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা থামাতে প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে পাল্টাপাল্টি হামলা এখনই বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু পুতিন তা চাইছেন না। তার মতে, উত্তেজনা কমানোর যেকোনো পদক্ষেপ হতে হবে পারস্পরিক এবং এর সঙ্গে প্রকৃত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। রিপাবলিকান দলের কয়েকজন রাজনীতিক এ চুক্তিকে গুরুতর ভুল বলে মন্তব্য করেছেন। মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স বলেছেন, রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে সাময়িকভাবে জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছেন বলেও জানান।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, রুশ জ্বালানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে, এমন পরিস্থিতির জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করাও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তিনি। জনসনের অভিযোগ, রাশিয়া প্রতিদিন ইউক্রেনের নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে, অথচ মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িচালকদের অর্থ শেষ পর্যন্ত পুতিনের যুদ্ধকে সহায়তা করতে পারে।

ডিজেল কেনার চুক্তিটি রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আগের অবস্থান থেকেও বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির জ্বালানির শীর্ষ পাঁচ ক্রেতাকে লক্ষ্য করে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। নতুন চুক্তির ফলে সেই নীতির সঙ্গে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে স্ট্রিটিং বলেছেন, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্তের কারণে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সমর্থনের প্রভাব অতিরঞ্জিত করা উচিত হবে না। তার ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যও বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম সংগ্রহ করে। পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়েও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইউক্রেনের মিত্রদের মধ্যে সর্বোচ্চ ঐক্য বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোর সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়েছে, এমন ধারণা না পান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের মিত্রদের ঐক্য ধরে রাখা এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখাই এখন যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকার। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

এএস
আরও পড়ুন